Thursday, October 14th, 2021




প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষায় ইসলাম।

মাওলানা মোঃ হাফিজুর রহমান রাজিবপুরী।
 প্রাক আলোচনা: সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে মানুষ পরস্পর একতাবদ্ধ হয়ে বসবাস করে আসছে। বাড়ীর পাশাপাশি বসবাসকারী আত্মীয় বা অনাত্মীয় লোকজনই প্রতিবেশী। মানুষের সুখে-দুঃখে, বিপদে-আপদে, হাসি-কান্না ইত্যাদি থেকে আরম্ভ করে মৃত্যুর পর কাফন-দাফন পর্যন্ত প্রতিটি ব্যাপারে একে অপরের সাহায্য ও সহযোগিতা করতে পারে। এরাই সর্বাগ্রে এগিয়ে আসে এবং সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত করে। কাজেই এই প্রতিবেশীর সাথে সদাচরণ করা জরুরী। প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্ককে সৌহার্দ্যপূর্ণ, আন্তরিক ও সহানুভূতিশীল করার লক্ষ্যে ইসলাম বিশেষভাবে নির্দেশ দিয়েছে। এই নির্দেশ প্রতিটি মানুষের জন্য অবশ্য পালনীয়।
প্রতিবেশীর পরিচয় : প্রতিবেশীর আরবী প্রতিশব্দ )জার) এবং ইংরেজী প্রতিশব্দ Neighbour. পারিভাষিক অর্থে- A person who lives next to you or near you. ‘তোমার পরে বা পার্শ্বে বসবাসকারী লোক।( মাসিক আত- তাহরীক, সেপ্টেম্বর/১৮)
ইবনুল মানযূর বলেন, প্রতিবেশী হচ্ছে যে ব্যক্তি আইনত তোমার পার্শ্বে অবস্থান করছে, সে মুসলিম হোক বা কাফের, পুণ্যবান হোক বা পাপী, বন্ধু হোক বা শত্রু, দানশীল হোক বা কৃপণ, উপকারী হোক বা অনিষ্টকারী, আত্মীয় হোক বা অনাত্মীয়, দেশী হোক বা বিদেশী।(লিসানুল আরব ৪খণ্ড,১৫৩-৫৪ পৃঃ)
প্রতিবেশী গণ্য হওয়ার সীমা : কত দূর এলাকার অধিবাসীরা প্রতিবেশী হিসাবে গণ্য হবে এ সম্পর্কে বিভিন্ন অভিমত পাওয়া যায়। যেমন- (১) হাসান (রাঃ) বলেন, নিজের ঘর হ’তে সম্মুখের চল্লিশ ঘর, পশ্চাতের চল্লিশ ঘর, ডান দিকের চল্লিশ ঘর এবং বাম পার্শ্বের চল্লিশ ঘর’ অর্থাৎ এর অধিবাসী লোকজনই প্রতিবেশী হিসাবে গণ্য।( আদাবুল মুফরাদ, হাদীস-১০৯)
(২) কেউ কেউ বলেন, চারিদিকের দশ ঘর প্রতিবেশী হিসাবে গণ্য হবে। (৩) আবার কেউ বলেন, যে ব্যক্তি ডাক শুনতে পায় সে প্রতিবেশী। (৪) যে অতি নিকটে বা পাশাপাশি থাকে সে প্রতিবেশী। (৫) অনেকে বলেন, প্রতিবেশী হচ্ছে যারা একই মসজিদে সমবেত হয়। (আত-তাক্বছীর ফী হুকূকিল জার, ১ম খণ্ড- ১পৃঃ)
প্রতিবেশীর প্রকার : দূরত্বের বিবেচনায় প্রতিবেশী দু’প্রকার : ১. নিকটবর্তী প্রতিবেশী ২. দূরবর্তী প্রতিবেশী (সুরা নিসা, আয়াত-৩৬)।
আচার-আচরণের দৃষ্টিতে প্রতিবেশী দুই প্রকার। ১. উত্তম প্রতিবেশী ও ২. নিকৃষ্ট প্রতিবেশী। উত্তম প্রতিবেশী সম্পর্কে রাসূল (ছাঃ) বলেন, একজন মুসলমানের জন্য খোলামেলা বাড়ী, প্রশস্ত বাসভবন, সৎপ্রতিবেশী ও রুচিসম্মত বাহন সৌভাগ্য স্বরূপ’। (আত-তারগীব,হাদীস-১৯১৪, ২৫৭৬)
অন্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন ,আল্লাহর নিকট সেই সাথী উত্তম, যে তার নিজ সাথীদের নিকট উত্তম এবং আল্লাহর নিকট সেই প্রতিবেশীই উত্তম, যে নিজের প্রতিবেশীর কাছে উত্তম’।(আদাবুল মুফরাদ হাদীস-১১৫)
পক্ষান্তরে নিকৃষ্ট প্রতিবেশী থেকে রাসূল (ছাঃ) দো‘আ করতেন এই বলে, হে আল্লাহ! আমি তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করছি দুষ্ট প্রতিবেশী হ’তে স্থায়ী বাসস্থানের। কেননা দুনিয়ার প্রতিবেশী পরিবর্তন হয়ে থাকে’।(আদাবুল মুফরাদ হাদীস-১১৭)
প্রতিবেশী সম্পর্কে বিশেষ তাকীদ : প্রতিবেশীর ব্যাপারে রাসূল (ছাঃ)-কে জিবরীল (আঃ) বার বার তাকীদ করতেন। রাসূল (ছাঃ) বলেন ,জিবরীল (আঃ) এসে আমাকে প্রতিবেশীর ব্যাপারে অবিরত উপদেশ দিতে থাকতেন। এমনকি মনে হ’ত যে, হয়ত তিনি প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকারী বানিয়ে দিবেন’।(বুখারী, মুসলিম, মিশকাত, হাদীস-৪৯৬৪)
উত্তম ব্যবহার পাওয়ার অধিকার : প্রতিবেশী আত্মীয় হোক অথবা অনাত্মীয়, মুসলিম হোক অথবা অমুসলিম যে কোন অবস্থায় সাধ্যানুযায়ী তাদের সাহায্য-সহায়তা করা ও তাদের খোঁজ-খবর নেয়া জরুরী। তাদের সাথে উত্তম আচরণ করা আল্লাহর নির্দেশ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন- ‘আল্লাহর ইবাদত কর, তাঁর সাথে কাউকে শরীক করো না। পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার কর এবং নিকটাত্মীয়, ইয়াতীম, মিসকীন, নিকটবর্তী প্রতিবেশী ও দূরবর্তী প্রতিবেশী, সহকর্মী, পথিক ও দাস-দাসীর সাথে ভাল ব্যবহার কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ অহংকারী-দাম্ভিককে পসন্দ করেন না’ (সুরা নিসা, আয়াত-৩৬)। এই আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা পিতামাতার সাথে ভাল ব্যবহারের নির্দেশ দানের পাশাপাশি নিকটবর্তী ও দূরবর্তী প্রতিবেশীর সাথেও উত্তম ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছেন। কেননা প্রতিবেশীরাই মানুষের বিপদ-আপদে সর্বাগ্রে এগিয়ে আসে। তাই এসব লোকের সাথে ভাল আচরণ করা সকলের জন্য অবশ্য কর্তব্য। রাসূল (ছাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহার করে’। অন্যত্র তিনি বলেন, -তুমি তোমার প্রতিবেশীর সাথে উত্তম ব্যবহার কর, তাহ’লে তুমি মুমিন হ’তে পারবে’।(. তিরমিযী, হাদীস-২৪৭৫) প্রতিবেশীর সাথে সদাচরণ করার মধ্যেই আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর ভালবাসা নিহিত আছে। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালবাসা পেতে ইচ্ছা করে সে যেন সদা সত্য কথা বলে, আমানত রক্ষা করে এবং প্রতিবেশীর উপকার করে’।(মিশকাত হাদীস-৪৯৯০)
প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেওয়া : সুশৃংখল ও শান্তিপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণে ও সুখী-সমৃদ্ধশালী জীবন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রতিবেশীর সাথে উত্তম ব্যবহার করা একান্ত জরুরী। নিজেকে নিয়ে যে সদা ব্যস্ত থাকে, নিজের স্বার্থ ব্যতীত যে অন্য কিছুই ভাবে না, প্রতিবেশীর বিপন্ন ও দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা, হৃদয়গ্রাহী হাহাকার, করুণ আর্তনাদ যার মনে রেখাপাত করে না, এমনকি স্বীয় স্বার্থ চরিতার্থ করার লক্ষ্যে তাদেরকে কষ্ট দিতে কুন্ঠিত হয় না, সে পূর্ণ মুমিন হতে পারে না। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়।( বুখারী হাদীস- ৫৬৭২) প্রতিবেশীর সাথে খারাপ আচরণ করা পাপ, এমনকি তা ঈমানহীনতার পরিচায়ক। নবী করীম (সা:) বলেছেন, আল্লাহর কসম! সে মুমিন নয়, আল্লাহর কসম! সে মুমিন নয়, আল্লাহর কসম! সে মুমিন নয়- জিজ্ঞেস করা হ’ল, হে আল্লাহর রাসূল (সা:)কে সেই ব্যক্তি? তিনি বললেন, যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ থাকে না’।(বুখারী ও মুসলিম) প্রতিবেশীকে কষ্ট দানকারী ব্যক্তি জান্নাতে যাবে না। রাসূল (ছাঃ) বলেন, সেই ব্যক্তি জান্নাতে যাবে না, যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদে থাকে না’।( মিশকাত হাদীস- ৯৬৩)
অপর একটি হাদীছে এসেছে, আবূ হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত একদা জনৈক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! অমুক মহিলা অধিক ছালাত পড়ে, ছিয়াম রাখে এবং দান-ছাদাক্বাহ করার ব্যাপারে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। তবে সে নিজের মুখের দ্বারা স্বীয় প্রতিবেশীদেরকে কষ্ট দেয়। তিনি বললেন, সে জাহান্নামী। লোকটি আবার বলল, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! অমুক মহিলা সম্পর্কে জনশ্রুতি আছে যে, সে কম ছিয়াম পালন করে, দান-ছাদাক্বাও কম করে এবং ছালাতও কম আদায় করে। তার দানের পরিমাণ হ’ল পনীরের টুকরা বিশেষ। কিন্তু সে নিজের মুখ দ্বারা স্বীয় প্রতিবেশীদেরকে কষ্ট দেয় না। তিনি বললেন, সে জান্নাতী’।(মুসনাদে আহমাদ, মিশকাত হাদীস- ৪৯৯২)
 প্রতিবেশীর সাথে ঝগড়া-বিবাদ না করা : প্রতিবেশীর সাথে কোন বিষয় নিয়ে বাক-বিতন্ডা ও ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হওয়া উচিত নয়। কেননা এতে উভয়ের মাঝে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। তাছাড়া এর জন্য ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহর সামনে বিচারের সম্মুখীন হ’তে হবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ক্বিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম ঝগড়াটে দুই প্রতিবেশীর মোকদ্দমা পেশ করা হবে’।(মিশকাত)
প্রতিবেশীকে হাদিয়া দেওয়া : উপহার আদান-প্রদানে পরস্পরের মধ্যে ভালবাসা সৃষ্টি হয়। নবী করীম (ছাঃ) বলেন, পরস্পরকে উপহার দাও। এতে তোমাদের মধ্যে ভালবাসা সৃষ্টি হবে’।(আদাবুল মুফরাদ হাদীস- ৫৯৪)
হাদিয়া প্রদানের ক্ষেত্রে নিকটতম প্রতিবেশীকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম, ” অর্থাৎ হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আমার দু’জন প্রতিবেশী আছে। আমি তাদের কার নিকট উপঢেŠকন পাঠাব? রাসূল (ছাঃ) বললেন, ‘যার দরজা (বাড়ী) তোমার বেশী নিকটবর্তী’।(. বুখারী, হা/২২৫৯) বাড়ীতে ভাল কোন খাদ্য বা তরকারী পাক হ’লে তাতে প্রতিবেশীকে শরীক করা রাসূল (ছাঃ)-এর নির্দেশ। তিনি আবু যর (রাঃ)-কে বলেন,‘হে আবু যর! যখন কোন তরকারী পাক করবে, তখন তাতে একটু বেশী পানি দিয়ে ঝোল বাড়াও এবং তোমার প্রতিবেশীকে পৌঁছাও’।(বুখারী হা/৬০১৪-১৫; মুসলিম হা/২৬২৪) অন্য বর্ণনায় আছে, যখন ঝোল পাকাবে তখন তাতে পানি বেশী করে দিবে এবং তৎপর প্রতিবেশীর প্রতি লক্ষ্য করবে ও তা তাদেরকে সদিচ্ছা সহকারে বিতরণ করবে’।( আদাবুল মুফরাদ হাদীস-১১৩) তিনি আরো বলেন, যখন তোমারা তরকারি পাকাও তখন তাতে পানি বেশী করে দিবে এবং তা প্রতিবেশীদের মাঝে বিতরণ করবে’।(মুসলিম, মিশকাত হাদীস-১৯৩৭)
প্রতিবেশী যে ধর্মেরই হোক না কেন সকলেই উত্তম আচরণ পাবার অধিকারী। বাড়ীতে কোন ভাল জিনিস তৈরী হ’লে কিংবা পশু-পাখি যবেহ করা হ’লে তার গোশ্ত মুসলমান প্রতিবেশীর ন্যায় বিধর্মী প্রতিবেশীর বাড়ীতেও প্রেরণ করা উচিত। একবার আব্দুল্লাহ বিন আমর (রাঃ)-এর বাড়ীতে তাঁর বালক ভৃত্য একটি ছাগলের চামড়া ছাড়াচ্ছিল। তিনি বললেন, হে বৎস! কাজ শেষ করে আমাদের ইহুদী প্রতিবেশী হ’তে (গোশ্ত বিতরণ) শুরু করবে। তখন সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তি বলে উঠল, কি ইহুদী? আল্লাহ আপনাকে সংশোধন করে দিন। তিনি বললেন, আমি নবী করীম (ছাঃ)-কে প্রতিবেশী সম্পর্কে উপদেশ প্রদান করতে শুনেছি।(আদাবুল মুফরাদ হাদীস-১২৪)
প্রতিবেশীকে অভুক্ত রেখে নিজে ভুরিভোজ না করা : দুঃখ-দৈন্য, অভাব-অনটন মানব জীবনের নিত্যসঙ্গী। এসব দিয়ে আল্লাহ মানুষকে পরীক্ষা করেন। আবার ধনী-দরিদ্রও আল্লাহ করে থাকেন। সুতরাং দরিদ্র প্রতিবেশীর খোঁজ-খবর নেওয়া আবশ্যক। প্রতিবেশী অভুক্ত থাকলে তাকে খাদ্য না দিয়ে নিজে পেট পুরে খাওয়া ঈমানদারের পরিচয় নয়। এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)বলেন, ঐ ব্যক্তি পূর্ণ মুমিন নয়, যে পেট পুরে খায় আর তার পাশেই তার প্রতিবেশী অভুক্ত থাকে’। (মিশকাত, হাদীস- ৪৯৯১)
প্রতিবেশীর দাওয়াত কবুল করা : সমাজের মানুষের মধ্যে সুসম্পর্ক ও আন্তরিকতা সামাজিক বন্ধনকে সুদূঢ় করে। আর পরস্পরকে দাওয়াত দিলে হৃদ্যতা বৃদ্ধি পায়। দাওয়াত কবুল করা রাসূলের নির্দেশও বটে। তিনি বলেন, যখন তোমাদের কাউকে খাবারের জন্য দাওয়াত দেয়া হয়, তখন সে যেন তাতে সাড়া দেয় বা দাওয়াত কবুল করে। অতঃপর ইচ্ছা হ’লে সে খাবে আর না হ’লে সে ছেড়ে দিবে’।(মুসলিম হা/১৪৩০; মিশকাত হা/৩২১৭) অন্য বর্ণনায় এসেছে, যখন তোমাদের কাউকে খাবারের জন্য আহবান জানানো হয়, তখন সে তাতে সাড়া দিবে। যদি সে ছায়েম হয়, তাহ’লে সে দো‘আ করবে’।(. তিরমিযী হাদীস-৭৮০, ইবনু মাজাহ হাদীস-১৭৫০)
মুসলমানের ছয়টি হকের অন্যতম হচ্ছে দাওয়াত কবুল করা। যেমন রাসূল (ছাঃ) বলেন, একজন মুসলমানের উপর অন্য মুসলমানের ছয়টা হক আছে। বলা হ’ল সেগুলি কি হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! তিনি বললেন, তার সাথে সাক্ষাৎ হ’লে সালাম দিবে; তোমাকে দাওয়াত দিলে কবুল করবে; পরামর্শ চাইলে সুপরামর্শ দিবে; হাঁচি দিয়ে আল-হামদুলিল্লাহ বললে ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বলবে; অসুস্থ হ’লে দেখতে যাবে এবং মারা গেলে জানাযায় শরীক হবে’।(মিশকাত, হাদীস-১৫২৫)
প্রতিবেশীর সুবিধা-অসুবিধার প্রতি লক্ষ্য রাখা : প্রতিবেশীর সুবিধা-অসুবিধার প্রতি লক্ষ্য রাখা ইসলামের নির্দেশ। এমনকি নিজের কিছুটা ক্ষতি হ’লেও প্রতিবেশীর সুবিধা করে দেওয়া ও তার অসুবিধা না করার নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘এক প্রতিবেশী যেন অপর প্রতিবেশীকে দেয়ালের সাথে খুঁটি গাড়তে নিষেধ না করে’।(বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হাদীস- ২৯৬৪)
প্রতিবেশীর জান-মাল, ইয্যত-আব্রু হেফাযত করা : প্রতিবেশীর মান-সম্মানের প্রতি লক্ষ্য রাখা যেমন যরূরী, তেমনি মাল-সম্পদ হেফাযত করাও অবশ্য কর্তব্য।
রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘মুসলিম সে ব্যক্তি যার হাত ও যবান থেকে অন্য মুসলিম নিরাপত্তা লাভ করে’।( বুখারী হাদীস-১০, মুসলিম হাদীস- ৪০) অন্য হাদীছে এসেছে, মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ (রাঃ) বলেন, অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) একদা তাঁর ছাহাবীগণকে ব্যভিচার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন, (তা কেমন? উত্তরে) তারা বললেন, হারাম; আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তা হারাম করেছেন। তখন তিনি বললেন, কোন ব্যক্তি দশজন নারীর সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হ’লেও তা তার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া অপেক্ষা লঘুতর (পাপ)। অতঃপর তিনি বললেন, কোন ব্যক্তির দশ ঘরের লোকজনের বস্ত্ত-সামগ্রী চুরি করা তার প্রতিবেশীর ঘরে চুরি করার চেয়ে লঘুতর’।( আদাবুল মুফরাদ হাদীস-১০৩)
প্রতিবেশীর দোষ-ত্রুটি গোপন রাখা : মানুষ দোষ-ত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়। ভাল এবং মন্দগুণের সমন্বয়ে মানুষ। প্রতিবেশীর দোষ গোপন রাখা অবশ্য কর্তব্য। কেননা মুসলিম ভাইয়ের দোষ গোপন রাখলে আল্লাহ ক্বিয়ামতে তার দোষ গোপন রাখবেন। রাসূল (ছাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি দুনিয়াতে কারো দোষ গোপন রাখে, ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ তার দোষ গোপন রাখবেন’।(মুসলিম হাদীস- ৪৬৯১) অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের দোষ গোপন করবে, আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ গোপন ( ইবনু মাজাহ হাদীস- ২৫৪৪) তিনি আরো বলেন, যে ব্যক্তি মুসলিম ভাইয়ের ত্রুটি গোপন রাখবে আল্লাহ ক্বিয়ামতের দিন তার দোষ গোপন রাখবেন। আর যে মুসলিম ভাইয়ের দোষ প্রকাশ করে দিবে, আল্লাহ তার দোষ প্রকাশ করে দিবেন। এমনকি তাকে অপদস্ত করবেন তার ঘরের ভিতরে’।( ইবনু মাজাহ, হাদীস- ২৫৪৬)
প্রতিবেশীর প্রতি অনুগ্রহ করা ও তাকে কর্যে হাসানা প্রদান করা :
পার্থিব জীবনে মানুষ অপরের সাহায্য ছাড়া চলতে পারে না। এজগতে কোন মানুষই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। বরং সে কোন না কোন ক্ষেত্রে অপরের মুখাপেক্ষী। প্রতিবেশীর কাজে সাধ্যমত সহায়তা করা তার প্রতি দয়ার বহিঃপ্রকাশ। আর মানুষের প্রতি মানুষের দয়া-অনুগ্রহে সমাজ সুন্দর হয়; আল্লাহর রহমত লাভ হয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা সেই ব্যক্তির উপর দয়া করেন না, যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি দয়া করে না’।(বুখারী হাদীস- ৭৩৭৬)
প্রতিবেশী কখনও সমস্যায় পড়লে কর্যে হাসানা দিয়ে তাকে সাহায্য করা উচিত। তাকে কর্যে হাসানা দিয়ে সাহায্য করলে আল্লাহ তা‘আলা সাহায্যকারীকেও সাহায্য করবেন।
এ মর্মে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,
‘যে ব্যক্তি কোন মুমিনের পার্থিব দুঃখ-কষ্ট দূর করবে, আল্লাহ ক্বিয়ামতে তার দুঃখ-কষ্ট দূর করবেন। যে ব্যক্তি কোন সংকটাপন্ন ব্যক্তির সংকট নিরসন করবে, আললাহ তার দুনিয়া ও আখিরাতের যাবতীয় সংকট নিরসন করে দিবেন। আর যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের দোষ-ত্রুটি গোপন করবে আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়া ও আখেরাতে তার দোষ-ত্রুটি গোপন রাখবেন। আর আল্লাহ ততক্ষণ পর্যন্ত বান্দার সাহায্য করে থাকেন, যতক্ষণ পর্যন্ত বান্দা নিজ ভাইয়ের সাহায্যে রত থাকে’।(মিশকাত, ‘কিতাবুল ইলম’ হাদীস- ২০৪) প্রয়োজনে প্রতিবেশীকে কর্যে হাসানা প্রদান করা। এটা এমন একটি সৎকাজ যার কারণে আল্লাহ দাতাকে অনেক পুণ্য দান করে থাকেন। এর ছওয়াব বহুগুণ হয় এবং এর দ্বারা অপরাধ ক্ষমা করা হয়।
মহান আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন, যদি তোমরা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দান কর, তিনি তোমাদের জন্যে তা দ্বিগুণ করে দিবেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন’ (তাগাবুন ১৭)। সুতরাং আমাদের প্রত্যেকের কর্তব্য সাধ্যমত অভাবী প্রতিবেশীকে কর্যে হাসানা প্রদান করা।
কর্যে হাসানার ফযীলত সম্পর্কে রাসূল (ছাঃ) বলেন, ছাদাক্বার ছওয়াব দশগুণ এবং কর্যে হাসানার ছওয়াব আঠারগুণ’ (সিলসিলা ছহীহাহ হা/৩৪০৭) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আরো বলেন, ‘যদি কোন মুসলিম ব্যক্তি তার অপর কোন মুসলিম ভাইকে দু’বার ঋণ প্রদান করে তবে তার আমলনামায় এ অর্থ একবার ছাদাক্বা করে দেয়ার সমান ছওয়াব লিখা হবে’।(. ছহীহুল জামে, হাদীস- ৫৭৬৯)
অন্য হাদীছে এসেছে, রাসূল (ছাঃ) বলেন, এক ব্যক্তি লোকদেরকে ঋণ দিত। সে তার কর্মচারীকে বলত, কোন ব্যক্তিকে ঋণ পরিশোধে অক্ষম দেখলে তাকে ক্ষমা করে দিও। এ কাজের বিনিময়ে আল্লাহ হয়তো আমাদেরকে ক্ষমা করে দিবেন। ঐ ব্যক্তি মৃত্যুর পর আল্লাহর নিকট পৌঁছলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন’।(. বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/২৯০১) অন্যত্র তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি এ কামনা করে যে আল্লাহ তা‘আলা তাকে ক্বিয়ামতের দিন দুঃখ-কষ্ট হ’তে মুক্তি দান করুন, সে যেন ঋণ পরিশোধে অক্ষম ব্যক্তির প্রতি সহজ পন্থা অবলম্বন করে কিংবা মাফ করে দেয়’।( মুসলিম, মিশকাত, হাদীস- ২৯০২) আবু কাতাদা (রাঃ) বলেন, আমি রাসূল (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি,‘যে ব্যক্তি ঋণ পরিশোধে অক্ষম ব্যক্তিকে অবকাশ দিবে অথবা ঋণ ক্ষমা করে দিবে, আল্লাহ তাকে ক্বিয়ামতের দিন দুঃখ-কষ্ট হ’তে মুক্তি দিবেন’।(মুসলিম, মিশকাত হাদীস- ২৯০৩)
অন্য বর্ণনায় এসেছে‘ ,যে ব্যক্তি ঋণ পরিশোধে অক্ষম ব্যক্তিকে অবকাশ দিবে অথবা তার ঋণ মাফ করে দিবে, আল্লাহ তা‘আলা ক্বিয়ামতের দিন স্বীয় ছায়ায় তাকে ছায়া দান করবেন’।(মুসলিম, হাদীস- ৩০০৬)
প্রতিবেশীর অসুস্থতায় দেখতে যাওয়া ও সেবা করা : রোগাক্রান্ত ও অসুস্থ হ’লে মানুষ অসহায় ও শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় কোথাও যেতে পারে না। বিছানায় শুয়ে শুয়ে তার সময় কেটে যায়। এমতাবস্থায় কেউ পাশে গিয়ে সান্ত্বনা দিলে সে স্বস্তি বোধ করে। অনুরূপভাবে অসুস্থ প্রতিবেশীকে দেখতে গেলে তাকে সে আপন মনে করে। তাছাড়া অসুস্থ ব্যক্তির খোঁজ-খবর নেয়া মুসলমানের অন্যতম দায়িত্ব। রোগীর দেখা-শোনা ও সেবা-শুশ্রূষাকে ইসলাম অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘ক্ষুধার্তকে খাদ্য দান কর, রুগ্ন ব্যক্তির দেখাশুনা কর এবং বন্দীকে মুক্ত কর’। ( মিশকাত, হাদীস- ১৫২৩) অন্যত্র তিনি বলেন, রুগ্ন ব্যক্তিকে দেখতে যাবে এবং জানাযার অনুসরণ করবে, তাহ’লে তা তোমাদেরকে আখেরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দিবে’।(আদাবুল মুফরাদ, হাদীস- ৫১৮)
রোগীকে দেখতে যাওয়া ও সেবা-শুশ্রূষা করা বিরাট পূণ্যের কাজও বটে। নবী করীম (সা:) বলেছেন, কোন মুসলিম যখন তার কোন রুগ্ন মুসলমান ভাইকে দেখতে যায়, তখন সে যেন জান্নাতের বাগানে ফল আহরণ করতে থাকে, যতক্ষণ না সে ফিরে আসে’।(মুসলিম, হাদীস- ২৫৬৮, মিশকাত, হাদীস- ১৫২৭) রাসূলুল্লাহ (সা:) আরো বলেন, ‘যদি কোন ব্যক্তি কোন রোগীকে দেখতে যায়, সে রহমতের মধ্যে ডুব দেয়, এমনকি সে যখন সেখানে বসে পড়ে, তখন সে রহমতের মধ্যেই অবস্থান করে’।(আদাবুল মুফরাদ, হাদীস- ৫২২) রাসূলুল্লাহ (সা:) এ ব্যাপারে আরো বলেন, ‘কোন ব্যক্তি কোন রোগীকে দেখতে গেলে অথবা আল্লাহর ওয়াস্তে তার কোন ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করলে, একজন আহবানকারী (অন্য বর্ণনায় রয়েছে আল্লাহ তা‘আলা) তাকে ডেকে বলেন, তুমি উত্তম কাজ করেছ, তোমার পদচারণা উত্তম হয়েছে এবং জান্নাতে তুমি একটি ঘর তৈরি করেছো। ( তিরমিযী হাদীস- ২০০৮) রাসূলুল্লাহ (সা:) অন্য হাদীসে ববলেন- ‘যে কোন মুসলমান সকাল বেলা কোন মুসলমান রোগীকে গেলেই তার জন্য সন্ধ্যা পর্যন্ত সত্তর হাযার ফেরেশতা দো‘আ করতে থাকে। আর সন্ধ্যা বেলা কোন রোগী দেখতে গেলে সকাল পর্যন্ত তার জন্য সত্তর হাযার ফেরেশতা দো‘আ করতে থাকে। আর তার জন্য জান্নাতে একটি ফলের বাগান সুনির্ধারিত করে দেয়া হয়’।(তিরমিযী হাদীস- ৯৬৯)
প্রতিবেশীর দুঃখ-শোকে সান্ত্বনা দেওয়া : প্রতিবেশীর যে কোন দুঃখ-শোকে তার পাশে দাঁড়ানো, তার প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করা এবং তাকে সান্ত্বনা প্রদান করা নেকীর কাজ। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার মুমিন ভাইকে বিপদে সান্ত্বনা প্রদান করবে, আল্লাহ তা‘আলা ক্বিয়ামতের দিন তাকে সম্মানের পোশাক পরিধান করাবেন’।( ইবনু মাজাহ হাদীস- ১৬০১)
প্রতিবেশীর জানাযায় অংশগ্রহণ : এক মুসলিমের প্রতি অপর মুসলিমের যে ছয়টি হক রয়েছে তন্মধ্যে অন্যতম হ’ল কেউ ইন্তিকাল করলে তার জানাযায় অংশগ্রহণ (মুসলিম, মিশকাত হাদীস- ১৫২৫) অন্যত্র রাসূল (ছাঃ) বলেন, এক মুসলমানের উপর অপর মুসলমানের হক পাঁচটি। সালামের জওয়াব দেওয়া, রোগীকে দেখতে যাওয়া, জানাযায় শরীক হওয়া, আহবানে সাড়া দেওয়া, হাঁচির জবাব দেওয়া’। (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হাদীস- ১৫২৪) জানাযায় অংশগ্রহণে প্রতিবেশীর হক যেমন আদায় হয়, তেমনি এতে অশেষ ছওয়াব রয়েছে। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও ছওয়াবের আশায় কোন মুসলমানের জানাযার অনুগমন করে এবং তার জানাযার ছালাত আদায় ও দাফন সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত সঙ্গে থাকে, সে দুই ক্বীরাত ছওয়াব নিয়ে প্রত্যাবর্তন করবে। প্রতিটি ক্বীরাত হ’ল ওহোদ পর্বতের মতো। আর যে ব্যক্তি শুধু তার জানাযা আদায় করে, তারপর দাফন সম্পন্ন হবার পূর্বেই চলে আসে, সে এক ক্বীরাত ছওয়াব নিয়ে প্রত্যাবর্তন করবে’।(বুখারী, হাদীস- ৪৭,মিশকাত, হাদীস- ১৬৫১)
প্রতিবেশীর মৃত্যু হ’লে তার পরিবারের জন্য খাদ্য সরবরাহ করা : কোন ব্যক্তি মারা গেলে তার পরিবার-পরিজন শোকে মুহ্যমান থাকে। ঐ সময় পাড়া-প্রতিবেশীদের কর্তব্য হ’ল তাদেরকে খাদ্য সরবরাহ করা। মু’তার যুদ্ধে জা‘ফর (রাঃ) শহীদ হ’লে রাসূলুল্লাহ (সা:) ছাহাবীদেরকে বলেছিলেন, তোমরা জা‘ফরের পরিবারের জন্য খাদ্যের ব্যবস্থা কর। কেননা আজ তাদের প্রতি এমন জিনিস বা এমন বিষয় এসেছে, যা তাদেরকে ব্যস্ত রেখেছে’।(ইবনু মাজাহ, হাদীস- ১৬১০, আবু দাঊদ, হাদীস- ৩১৩২
প্রতিবেশীর অসদাচরণের প্রতিকার : কোন ব্যক্তি তার প্রতিবেশীকে কষ্ট দিলে তার প্রতিকার কৌশলে করা উচিত। এ মর্মে হাদীছে এসেছে, আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! অর্থাৎ আমার এক প্রতিবেশী আমাকে পীড়া দেয়। তিনি বললেন, যাও, তোমার গৃহ-সামগ্রী রাস্তায় বের করে রাখ। সে ব্যক্তি তখন ঘরে গিয়ে তার গৃহসামগ্রী রাস্তায় বের করে রাখল। এতে তার পাশে লোকজন জড়ো হয়ে গেল। তারা জিজ্ঞেস করল, তোমার কি হয়েছে? সে বলল, আমার প্রতিবেশী আমাকে পীড়া দেয়। আমি তা নবী করীম (সা:)-কে বললে তিনি বললেন, যাও, ঘরে গিয়ে তোমার গৃহসামগ্রী রাস্তায় বের করে রাখ। তখন তারা সেই প্রতিবেশীটিকে ধিক্কার দিতে দিতে বলতে লাগল, হে আল্লাহ! এর উপর তোমার অভিসম্পাত হোক। হে আল্লাহ! তাকে অপমানিত ও লাঞ্ছিত কর। এ কথা ঐ প্রতিবেশীর কানে গেল এবং সে সেখানে উপস্থিত হ’ল। সে তখন বলল, তুমি তোমার ঘরে ফিরে যাও। আল্লাহর কসম! আর কখনো আমি তোমাকে পীড়া দেব না’।(আদাবুল মুফরাদ, হাদীস- ১২৪)
প্রতিবেশীদের মাঝে ন্যায়বিচার করা : প্রতিবেশীদের মাঝে কোন বিষয়ে সমস্যা দেখা দিলে ন্যায়সঙ্গতভাবে এর সমাধান করা ইসলামের নির্দেশ। এতে ছাদাক্বার ছওয়াব পাওয়া যায়। বিবাদ মীমাংসার জন্য আল্লাহর নির্দেশ, নিশ্চয়ই মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই।
সুতরাং তোমাদের ভাইদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আশা করা যায় তোমরা রহমতপ্রাপ্ত হবে’ (হুজুরাত ৪৯/১০)।
বিবাদ মীমাংসা করা শরী‘আতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও পুণ্যের কাজ। রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেন, ‘আমি কি তোমাদেরকে ছিয়াম, ছালাত ও ছাদাক্বার চেয়ে উত্তম মর্যাদাকর বিষয় সম্পর্কে খবর দেব না? ছাহাবীগণ বললেন, অবশ্যই হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! তিনি বললেন, إِ‘বিবাদমান বিষয়ে মীমাংসা করা’।(আবূ দাঊদ হাদীস- ৪৯১৯, তিরমিযী হাদীস- ২৬৪০) মুসলিম ভাইদের মাঝে বিবাদ মীমাংসা করে দিলে ছাদাক্বা করার ছওয়াব পাওয়া যায়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘তোমার দুই ব্যক্তির মধ্যে ন্যায়সঙ্গতভাবে বিচার-ফায়ছালা করা একটি ছাদাক্বা’।( মুসলিম হাদীস- ১০০৯)
প্রতিবেশীকে হত্যা করা ক্বিয়ামতের আলামত : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) প্রতিবেশীর সাথে উত্তম ব্যবহার করতে বলেছেন এবং তাদেরকে কষ্ট দিতে নিষেধ করেছেন। অথচ বর্তমানে তুচ্ছ কারণে মানুষ প্রতিবেশীকে হত্যা পর্যন্ত করছে। এটা ক্বিয়ামতের পূর্ব লক্ষণ। রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন- ‘ক্বিয়ামত হবে না যতক্ষণ না কোন ব্যক্তি তার প্রতিবেশী, তার ভাই এবং পিতাকে হত্যা করবে’।(আদাবুল মুফরাদ, হাদীস- ১১৮)
উপসংহার: উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, প্রতিবেশীর হক অত্যধিক। তাদের সাথে সদাচরণ করা প্রত্যেক মুমিনের অবশ্য কর্তব্য। তাদের কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকা রাসূলের নির্দেশ। খাদ্য আদান-প্রদান ও উত্তম আচরণের মাধ্যমে তাদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা জরুরী। প্রতিবেশীর হক আদায় না করলে এবং তাদের সাথে ভাল ব্যবহার না করলে জান্নাত পাওয়া দুষ্কর হবে। তাছাড়া সমাজকে সুন্দর করার জন্য প্রতিবেশীর সাথে সদ্ভাব- সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং তার সাথে সদাচরণ করা হক্কুল ইবাদতের মধ্যে অন্যতম একটি। এতে সমাজে শান্তি- শৃঙ্খলা বিরাজ করে এবং প্রতিবেশীর হক আদায় করলে পার্থিব জীবনে উপকারের পাশাপাশি পরকালীন জীবনেও অশেষ ছওয়াব অর্জিত ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ আমাদেরকে প্রতিবেশীর হক আদায় করার তাওফীক্ব দান করুন। (আমীন)
মাওলানা মোঃ হাফিজুর রহমান রাজিবপুরী
উপাধ্যক্ষ বাঘার চর ইসলামিয়া আলিম মাদরাসা
দেওয়ানগঞ্জ, জামালপুর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category