সা‌রি নদীর বাঁ‌কে লালাখাল

মোহাম্মদ শা‌ব্বির হোসাইন: সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলায় একটি দর্শনীয় পর্যটন এলাকা লালাখাল। পর্যট‌নের দৃ‌ষ্টি‌কোণ থে‌কে এর গুরুত্ব অপ‌রিসীম। লালাখালের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে সারি গোয়াইন নদী। সেই নদীতে রয়েছে অসংখ্য বাঁক। নদীটির কূলে পাহাড়ি বন, চা-বাগান এবং নানা প্রজাতির বৃক্ষরাজি রয়েছে। লালাখা‌লের একপা‌শে বাংলা‌দেশ ও অপরপা‌শে ভার‌তের অংশ র‌য়ে‌ছে।

 

ভারতের চেরাপুঞ্জির ঠিক নিচেই লালাখালের অবস্থান। চেরাপুঞ্জি পাহাড় থেকে উৎপন্ন এই নদী বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হ‌য়ে‌ছে। লালাখালের পানি নীল। মূলত জৈন্তিয়া পাহাড় থেকে আসা প্রবাহমান পানির সাথে মিশে থাকা খনিজ এবং কাদার পরিবর্তে নদীর বালুময় তলদেশের কারণেই এই নদীর পানির রঙ এ রকম দেখায়। লালাখাল নদীতে অসংখ্য বাঁকের দেখা মেলে। সা‌পের ম‌তো এ নদী এঁকেবেঁ‌কে এগি‌য়ে গে‌ছে পাহাড়ী ভূ‌মি ও বিশাল সব বৃক্ষরা‌জি ভেদ ক‌রে।

এ নদী দিয়েই বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা বাংলাদেশে এসেছিলেন। জায়গাটার নামের সঙ্গে ‘খাল’ শব্দ যুক্ত হলেও এটি মূলত একটা নদীরই অংশ। নদীর নাম সারি। কেননা, চেরাপুঞ্জি পাহাড় থেকে বেয়ে আসা পানি গড়িয়ে চলেছে লালাখাল দিয়ে। লালাখালকে কেনো লালাখাল বলা হয়, তা অবশ্য জানা যায়নি।

সরকারী বিধিনিষেধের কো‌নো তোয়াক্কা না করায় এ এলাকার উদ্ভিদবৈচিত্র্যকে করে তুলেছে হুমকির সম্মুখীন। এছাড়া অনুমোদনহীনভাবে পাথর উত্তোলন নদী এবং নদী অববাহিকার ভূমিকে হুমকির সম্মুখীন করে তু‌লেছে। এলাকার প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপে বিপুল পরিমাণ গাছ কেটে ফেলে প‌রি‌বে‌শের ভারসাম্য বিনষ্ট করার কারণে প্রায়ই সেখানে নানা রোগব্যাধির প্রকোপ লক্ষ্য করা যায়। তাছাড়া উজান থেকে নেমে আসা পাথর আর বালুতে সয়লাব হয়ে যাওয়ায় নদীর নাব্যতা কমে গেছে। ফলে হঠাৎই উজান থেকে নেমে আসা ঢলে ক্ষতিগ্রস্থ হয় নিকটবর্তী অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা।

এমন সুন্দর ও‌ আকর্ষণীয় এক‌টি দর্শনীয় স্থান অথচ সরকারীভা‌বে যথাযথ দেখভা‌লের ঘাট‌তি থাকায় এখা‌নে আসা অসংখ্য পর্যটক‌কে নানা‌বিধ সমস্যায় পড়‌তে হয়। লালাখাল দেখ‌তে আসা দর্শনার্থী‌দের বে‌শিরভাগই সি‌লেট~‌জাফলং সড়‌কের সা‌রিঘাট নামক স্থান থে‌কে ইঞ্জি‌নের নৌকায় ক‌রে সীমা‌ন্তের জি‌রো প‌য়েন্ট পর্যন্ত ভ্রমণ ক‌রেন। সময় লা‌গে ত্রিশ ‌থে‌কে চ‌ল্লিশ মি‌নি‌টের ম‌তো। নৌকা জি‌রো প‌য়ে‌ন্টের কাছাকা‌ছি গি‌য়ে দর্শনার্থী‌দের চা‌হিদা ম‌তো ১০/১৫/২০ মি‌নিট বা তার‌চে‌য়েও বে‌শি সময় অপেক্ষা ক‌রে ফি‌রে আসে। এ সম‌য়ের ম‌ধ্যে তাঁরা নৌকা থে‌কে প্রকৃ‌তির কোল ঘেঁ‌ষে ইচ্ছা মতো ছ‌বি তো‌লেন। সা‌রিঘাট থে‌কে জি‌রো প‌য়েন্ট পর্যন্ত ঘু‌রে আসার জন্য প্র‌তি‌টি নৌকা দর্শনার্থী‌দের কা‌ছে থে‌কে দুই হাজার থে‌কে আড়াই হাজার পর্যন্ত টাকা আদায় কর‌ছে যেটা শুধু অস্বাভা‌বিকই নয় বরং দৃ‌ষ্টিকটূও ম‌নে হ‌য়। দর্শনার্থীরা ভাড়া বে‌শির অভি‌যোগ কর‌লে তারা জানায়, মৌসুম (জুন~আগষ্ট) ও ঈদের সিজ‌নে ভাড়া একটু বে‌শি প্রশাস‌নের অনুম‌তিক্র‌মে। য‌দিও এ সংক্রান্ত প্রশাস‌নের কে‌ানো ‌নি‌র্দেশনামা তারা দেখা‌তে পা‌রে‌নি ত‌বে এ বিষয়টা যে কা‌রো ছত্রচ্ছায়ায় থে‌কে ঘট‌ছে তা স‌চেতন মানু‌ষের বুঝ‌তে অসু‌বিধা হয় না।

যাঁরা একটু ভা‌লো ক‌রে খোঁজ খবর নি‌য়ে আসেন কিংবা সি‌লে‌টে প‌রি‌চিত কেউ আছে তাঁরা সা‌রিঘাট থে‌কে না উঠে একটু সাম‌নে এগি‌য়ে ডান দি‌কের পথ ধ‌রে এগি‌য়ে যান আরও ৪/৫ কি‌লো‌মিটার সাম‌নে নর্দার্ণ রি‌সো‌র্টের সাম‌নে। সেখানকার ঘাট থে‌কে তুলনামূলক ক‌মে অর্থাৎ পাঁচ থে‌কে সাত শত টাকায় জি‌রো প‌য়েন্ট যাওয়া যায়। কিন্তু সিজ‌নের অযুহা‌তে সেখানকার নৌকার মা‌লিকরা এক হাজার থে‌কে  এক হাজার দুইশত টাকা পর্যন্ত আদায় কর‌ছে। অথচ এ ব্যাপা‌রে দেখার কেউ নেই!

নদীর একপা‌শে যাওয়া গে‌লেও অপর পা‌শে যাওয়া বারণ। কারণ সেখা‌নে র‌য়ে‌ছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বা‌হিনী বিএসএ‌ফের সশস্ত্র উপ‌স্থি‌তি। ফি‌রে আসার প‌থে দেখার ম‌তো জায়গা হ‌লো লালাখাল চা বাগান। নৌকা থে‌কে নে‌মে উঁচু নিচু পাহাড়ী পথ বে‌য়ে চা বাগা‌নের ভেতর দি‌য়ে অনেক ওপ‌রে উঠ‌লেই সেখা‌নে রয়ে‌ছে লালাখাল চা কারখানা, যেখা‌নে শ্র‌মি‌কেরা কাঁচা চা পাতা সংগ্রহ ক‌রে পিকআ‌পে ক‌রে নি‌য়ে যা‌চ্ছে এবং সেগু‌লিকে বড় বড় বস্তায় ভ‌রে মু‌ভিং বে‌ল্টে তু‌লে দি‌চ্ছে। পর্যায়ক্র‌মে বস্তাগু‌লি আরও ওপ‌রের নি‌র্দিষ্ট এক‌টি ক‌ক্ষে চ‌লে যা‌চ্ছে এবং সেখা‌নে বি‌ভিন্ন স্ত‌রে কা‌টিং ক‌রে প্র‌ক্রিয়াজাত হ‌য়ে বে‌ল্টের মাধ্য‌মে গি‌য়ে এক‌টি নি‌র্দিষ্টস্থা‌নে জমা হ‌চ্ছে। এ প্র‌ক্রিয়াজাতকরণ প্র‌ক্রিয়া সুন্দর এক‌টি চেইন সি‌স্টে‌মের মাধ্য‌মে সংঘ‌টিত হয়।

‌যেভা‌বে চা সম্পন্ন হয় প্রক্রিয়াজাতকরণ প্র‌ক্রিয়াঃ
প্লাকিংঃ চা বাগান থেকে চায়ের দুটি পাতা একটি কুঁড়ি সংগ্রহ করার প্রক্রিয়াকে প্লাকিং বলা হয়। প্লাকিং সাধারণত হাতে বা মেশিনের সাহায্যে করা যায়। তবে বাংলাদেশে হাতে প্লাকিং বেশি করা হয়ে থাকে।
উইদারিংঃ কালো চা প্রক্রিয়াজাত করণের ১ম ধাপ উইদারিং। এই ধাপে বাগান থেকে সংগ্রহ করা দুটি পাতা একটি কুঁড়ি ৮-১০ ঘন্টা রেখে দেয়া হয়। যাতে করে আর্দ্রতা হ্রাস পায় এবং পাতাগুলি মলিন হতে শুরু করে। এই ধাপে চা এর বিভিন্ন রাসায়নিক পরিবর্তন শুরু হতে থাকে।

রোলিংঃ এই ধাপে চায়ের পাতা গুলি খুব ছোট ছোট করে কাটা হয়। এই কাটা কাজটি করা হয় CTC মেশিনের সাহায্যে। রোলিং এর সময় পাতার কোষ প্রাচীরগুলি ভেঙ্গে যায়, এর ফলে পলিফেনল এবং পলিফেনল অক্সিডেজ এনজাইম একত্রিত হয়ে মিশ্রিত হয়।

অক্সিডেশন/ জারণঃ ব্লাক টি বা কালো চা প্রক্রিয়াজাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অক্সিডেশন বা জারণ। এই ধাপকে ফারমেন্টেশন বলা হয়। রোলিং এর পরে চায়ের পাতাগুলিকে ১ থেকে ২ ঘন্টার জন্য বাতাসের উপস্থিতিতে জারিত হবার জন্য রেখে দেয়া হয়। এই জারণের জন্য চায়ের রঙ কালচে হয়ে থাকে। এই ধাপেই থিয়োরুবেজিন ও থিয়োফ্লাবিন তৈরি হয় যা চায়ের গুনগত মান প্রকাশ করে থাকে।

শিফটিংঃ এই ধাপে ফার্মেন্টেড চা পাতাগুলিকে গুগি শিফটারের মধ্যদিয়ে চালনা করা হয় এবং এই চালনা করার ফলেই চা পাতা গুলি দানাদার আকার ধারণ করে।

ড্রাইয়িং/শুষ্কী করণঃ এই ধাপে চা পাতাগুলিকে ড্রায়ারের /শুষ্কীকরণ যন্ত্রের সাহা‌য্যে শুষ্ক করা হয়ে থাকে। শুকানোর পরে চা পাতার আদ্রর্তা হয় ৩-৪%।

গ্রেডিংঃ গ্রেডিং হচ্ছে চা প্রক্রিয়াজাতকরণের সব শেষ ধাপ। এই ধাপে চা’কে বিভিন্ন গ্রেডে ভাগ করা হয়ে থাকে।

চা‌’য়ের প্র‌ক্রিয়াজাতকরণ সম্পন্ন হ‌লেই তা মা‌র্কে‌টিং‌য়ের বি‌ভিন্ন চ্যা‌নে‌লের মাধ্য‌মে ক্রেতার হাত পর্যন্ত এসে পৌঁ‌ছে।

কীভা‌বে যা‌বেন লালাখালঃ
সিলেট থেকে লালাখালে যেতে হলে নগরীর ধোপাদিঘীর ওসমানী শিশু উদ্যানের বা শিশু পার্কের সামনে থেকে লেগুনা, মাইক্রোবাস অথবা জাফলংগামী বাসে চড়ে সারিঘাট আসতে পারেন। সারিঘাট সিলেট এবং জাফলং এর মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। সারিঘাট থেকে লালাখালে যাবার সিএনজিচালিত অটোরিকশা পাওয়া যা‌বে। যদি নদীপথে লালাখালে যেতে চান তবে এখানে ইঞ্জিন চালিত বিভিন্ন ট্রলার ও নৌকা ভাড়ায় পাওয়া যা‌বে। লালাখাল থেকে সিলেট ফিরতে রাত ৮ টা পর্যন্ত বাস ও লেগুনা পাওয়া যায়।

সিলেট থেকে লালাখাল যেতে মাইক্রোবাসে ভাড়া লাগবে ২০০০ থেকে ৩০০০ টাকা। বাস কিংবা লেগুনায় সারিঘাট যেতে ৪০ থেকে ৬০ টাকা খরচ হবে। সারিঘাট থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় লালাখালে যেতে ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা এবং স্পিডবোটে যেতে ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা লাগবে। কম খরচে লালাখাল যেতে চাইলে সারিঘাট ব্রিজ পার হয়ে উত্তর দিকে মসজিদ থেকে একটু এগিয়ে ডান দিকে লালাখালের রাস্তায় সারি সারি অটো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাবে। সিরিয়ালের ভিত্তিতে চলা এসব অটোতে জনপ্রতি ভাড়া লাগে ১৫ টাকা। অটো থেকে নেমে লালাখাল ঘাটে গেলেই সবুজ পানির চমৎকার দৃশ্য দেখা যা‌বে।

এখানে ছাউনি দেয়া রঙিন নৌকায় ঘুরতে চাইলে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা লাগবে আর আরো কম টাকায় নৌকা ভাড়া করতে খেয়া পার হয়ে নদীর অপর পাড়ে ছাউনি ছাড়া নৌকাগুলোর কাছে যাওয়া যে‌তে পা‌রে। এখানে নৌকাগুলোর সিরিয়াল আছে, একটু দরদাম করে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় ইচ্ছে মতো সময়ের জন্য ভাড়া করা যায়।

কোথায় থাকবেনঃ
লালাখালের পাড়ে রাত কাটাতে নর্দার্ন রিসোর্টে বুকিং দিতে পারেন। অতিথিদের সিলেট যাওয়া আসার জন্য এদের নিজেদের পরিবহন ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া লালাখালের কাছে খাদিমনগরে অবস্থিত নাজিমগড় রিসোর্টে আগেই যোগাযোগ করে নিতে পারেন। কারণ সিজনে রিসোর্টের সব রুম বুক থাকতে পারে। নাজিমগড় রিসোর্টে টেরেস, ছোট বাংলো এবং বড় ভিলায় রাত্রি যাপনের সুযোগ রয়েছে। এই রিসোর্টটি আধুনিক সুযোগ-সুবিধায় ভরপুর। প্রতি রাতের জন্য নাজিমগড় রিসোর্টের প্রিমিয়ার কক্ষের ভাড়া ৭,০০০ টাকা এবং প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুইটের ভাড়া ১৫,০০০ টাকা।

তবে থাকার জন্য সিলেট ফিরে আসাই সুবিধাজনক। সিলেটের লালা বাজার ও দরগা রোডে কম ভাড়ায় অনেক মানসম্মত রেস্ট হাউস আছে৷ যেখানে ৪০০ থেকে ১,০০০ টাকায় বিভিন্ন ধরণের রুম পাবেন। এছাড়াও হোটেল হিল টাউন, গুলশান, দরগা গেইট, সুরমা, কায়কোবাদ ইত্যাদি হোটেলে আপনার প্রয়োজন ও সামর্থ্য অনুযায়ী থাকতে পারবেন।

এ সকল আকর্ষণীয় স্থান ভ্রম‌ণের জন্য পূর্ব থে‌কেই য‌থেষ্ট তথ্য সংগ্রহ ক‌রে সে মোতা‌বেক প‌রিকল্পনা ক‌রে যাওয়াটা হ‌বে বু‌দ্ধিমা‌নের কাজ। নে‌টে সার্চ দি‌লেও এ ব্যাপা‌রে বহু তথ্য পাওয়া যা‌বে। আর য‌দি সি‌লেট থে‌কে মাই‌ক্রো বা অটো ভাড়া ক‌রে গি‌য়ে ড্রাইভার‌কে গাইড হি‌সে‌বে শতভাগ বিশ্বাস ক‌রেন তাহ‌লে আপনার ঠকার আশংকা র‌য়ে‌ছে বহুগুণ। কারণ ওসব এলাকার হো‌টেল, রেস্টু‌রেন্ট, কো‌নো কো‌নো ক্ষে‌ত্রে নৌকার মা‌ঝি‌দের সা‌থেও রেন্ট-এ-কা‌রের ড্রাইভার‌দের ক‌মিশ‌নের একটা হিসাব থা‌কে। সেজন্য তারা আপনা‌কে বি‌ভিন্ন কৌশ‌লে তা‌দের নির্ধা‌রিত জায়গায় নেয়ার চেষ্টা কর‌বে। এর ফ‌লে আপনার প‌কেট থে‌কে বে‌রি‌য়ে যে‌তে পা‌রে অতি‌রিক্ত কিছু টাকা।

এম কে ইসলাম/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category