সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে ছাত্রদলের ভরাডুবি

কালের সংবাদ ডেস্কঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনে ছাত্রদল প্রার্থীদের ভরাডুবিতে বিস্মিত সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। একটি পদেও জয়ী হতে পারবে না- এটা তারা কল্পনাও করতে পারেননি।

সাংগঠনিক দুর্বলতাসহ বেশ কয়েকটি কারণে এই ভরাডুবি বলে মনে করছেন অনেকে। এ নিয়ে অসন্তোষ বিএনপির নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও।

মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মতে, ছাত্র অধিকার সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে ছাত্রদল সক্রিয় ছিল না। আবার সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির প্রায় সবাই অছাত্র।

গত দশ বছরে ক্যাম্পাসে অবস্থান করতে না পারায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ গড়ে ওঠেনি। এ ছাড়া মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি, প্যানেল গঠনে জটিলতা ও যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া ভোটে অংশ নেয়ার ফলে ডাকসু নির্বাচনে অকল্পনীয় বিপর্যয় হয়েছে।

তবে ছাত্রদলের শীর্ষ নেতাদের দাবি- ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপির কারণে তাদের প্রার্থীরা বিজয়ী হতে পারেননি। ছাত্রদলের ভিপি ও জিএস পদে যে ভোট পড়েছে তাতে এ সন্দেহের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। ভিপি পদে মাত্র ২৪৫ ভোট পড়েছে। তাহলে সংগঠনের নেতাকর্মীরা কি ভোট দেননি?

সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি রাজিব আহসান যুগান্তরকে বলেন, ‘এবারের ডাকসু নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপি হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এ ধরনের কলঙ্কময় ঘটনা এর আগে ঘটেনি। এটা শুধু ছাত্রদল নয়, ছাত্রলীগ বাদ দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থী ও সব ছাত্র সংগঠনের উপলব্ধি। শিক্ষকসমাজ, বিগত দিনে যারা ডাকসু নেতৃত্ব দিয়েছেন- সবাই এ নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।’

ছাত্রদলের সাংগঠনিক দুর্বলতার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে ছাত্রলীগের ভূমিকা যদি সাংগঠনিক হতো, তাহলে ছাত্রদলের সাংগঠনিক অবস্থা পাওয়া যেত। ছাত্রদল দুর্বল থাকলে তারা সেভাবেই নির্বাচনের আয়োজন করত।’

১৯৯০ সালের ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদল স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের জেরে ডাকসুতে বড় বিজয় পেয়েছিল। কিন্তু সোমবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ছাত্রদল ডাকসুর ২৫টি পদের একটিতেও জয় পায়নি। এমনকি প্রার্থীদের মধ্যে সম্পাদকীয় একটি পদ ছাড়া কেউ হাজারের ওপরে ভোট পাননি।

১২টি সম্পাদকীয় পদের মাত্র একটিতে ছাত্রদলের প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসতে পেরেছেন। কমনরুম ও ক্যাফেটেরিয়া বিষয়ক সম্পাদক পদে প্রার্থী কানেতা ইয়া লাম-লাম ৭ হাজার ১১৯ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন।

ভিপি পদে এই সংগঠনের প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান ২৪৫ ভোট পেয়ে পঞ্চম হয়েছেন। জিএস প্রার্থী আনিসুর রহমান খন্দকার ৪৬২ ভোট পেয়ে ষষ্ঠ হয়েছেন। আর এজিএস প্রার্থী খোরশেদ আলম সোহেল পেয়েছেন মাত্র ২৯৪ ভোট।

এ ছাড়া ১৮টি হল সংসদের কোনো পদেও ছাত্রদল জয় পায়নি। প্রতিদ্বন্দ্বিতায়ও ছিল না। হল সংসদগুলোতে ২৩৪টি পদের বিপরীতে ছাত্রদলের প্রার্থী ছিলেন মাত্র ৫৪ জন।

এ প্রসঙ্গে ছাত্রদল প্যানেলের ভিপি প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘কিরকম নির্বাচন হয়েছে, তা সবাই দেখেছেন। ১০ তারিখ রাতেই ব্যালট পেপারে সিল দেয়া হয়েছে ছাত্রলীগকে জেতানোর জন্য। সকালে ভোটের আগেই কুয়েত মৈত্রী হল থেকে সিল মারা ব্যালট উদ্ধার করা হয়েছে। অনেকে ভোটই দিতে পারেননি, সে জায়গায় ৯ হাজার ভোটের ব্যবধানে অনেকে জয়ী হয়েছেন। তাদের বিজয়ী দেখানো হয়েছে। কারচুপির মাধ্যমে পুরোপুরি নীলনকশার নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে।’

সংশ্লিষ্টরা জানান, তফসিল ঘোষণার পর ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে ছাত্রদলে দ্বিধাবিভক্তি ছিল। সুষ্ঠু ও অবাধ ভোট নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের অধিকাংশ নেতা নির্বাচনে অংশ নেয়ার বিরোধিতা করেন।

ডাকসুর সাবেক সাধারণ সম্পাদক (জিএস) ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন বলেন, ছাত্রদলকে গত দশ বছরে ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাতে দেয়া হয়নি। ছাত্রলীগ একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার সহাবস্থানের ব্যাপারে দাবি জানানো হলেও কর্ণপাত করেনি। দশ বছরে ছাত্রদলের ক্যাম্পাসে অনুপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা তো ডাকসু নির্বাচনে প্রভাব পড়েছে। ভোট কারচুপির মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যে নির্বাচন করেছে তা নজিরবিহীন।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ যুগান্তরকে বলেন, ছাত্রদলের বেশিরভাগ নেতাকর্মীই হলে থাকার সুযোগ পায়নি, বাইরে ছিল। এ নির্বাচন উপলক্ষে তারা সাহস করে যে সব হলে প্রচার চালাবে তাও সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া নিয়মিত ছাত্রদের হাতে সংগঠনের নেতৃত্বে না থাকাটাও পরাজয়ের অন্যতম কারণ।

তিনি বলেন, সব দল-মতের ছাত্রছাত্রীরা লেখাপড়া করবে, বিভিন্ন হলে থাকবে। এই অধিকার সবার আছে। এই পরিবেশটা যদি না পাওয়া যায় তাহলে কি করার আছে। আমি যখন উপাচার্য ছিলাম তখন ‘পরিবেশ পরিষদ’ করেছিলাম। সব সংগঠনের নেতাদের ৫ জন করে নিয়ে ‘পরিবেশ পরিষদের’ বৈঠক করা হতো। সেখানে সবার কথা বলার সুযোগ ছিল। নিজের মধ্যে সমস্যাগুলো সমাধান করার একটা প্রক্রিয়া ছিল। এখন তা নেই। এটা হলেও তো ক্যাম্পাসে সহাবস্থান থাকত।

এনআই/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category