Sunday, June 26th, 2022




সমাজকল্যাণমূলক কাজ ইবাদততুল্য

সমাজকল্যাণমূলক কাজ ইবাদততুল্য

কালের সংবাদ ডেস্কঃ মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনের অসংখ্য আয়াতে সমাজকল্যাণমূলক কাজকে ইবাদত ও সওয়াবের কাজ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এক আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘পূর্ব ও পশ্চিমে মুখ ফেরানোটাই সৎকর্ম নয়, বরং প্রকৃত সৎকর্মশীল ওই ব্যক্তি, যে বিশ্বাস স্থাপন করে আল্লাহ, পরকাল, ফেরেশতামণ্ডলী, আল্লাহর কিতাব ও নবীদের ওপর এবং যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে সম্পদ ব্যয় করে নিকটাত্মীয়, এতিম, মিসকিন, মুসাফির, প্রার্থী ও দাসমুক্তির জন্য। ’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৭৭)

এখানে ইসলামে সমাজকল্যাণমূলক কাজের গুরুত্ব তুলে ধরা হলো—

এতিম প্রতিপালন : সমাজের সবচেয়ে অসহায় অবহেলিত, নিঃস্ব, লাঞ্ছিত, বঞ্চিত ও নিরাপত্তাহীনভাবে দিনাতিপাত করে একজন এতিম শিশু। তাই সমাজকল্যাণমূলক কাজে সহযোগিতা পাওয়ার ক্ষেত্রে এক নম্বরে আছে এতিম শিশু।

এতিমদের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করার বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘যারা অন্যায়ভাবে এতিমের সম্পদ ভক্ষণ করে, তারা তাদের পেটে শুধু আগুন ভর্তি করে। শিগগির তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। ’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১০)

এতিম প্রতিপালনকারীদের মর্যাদা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমি ও এতিম প্রতিপালনকারী জান্নাতে এভাবে থাকব। এ কথা বলে তিনি তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল দিয়ে ইশারা করেন এবং এ দুটির মধ্যে কিছুটা ফাঁকা করেন। (বুখারি, হাদিস : ৫৩০৪; মুসলিম, হাদিস : ২৯৮৩)

বিধবাকে সহায়তা দান : সমাজের আরেক অসহায় শ্রেণির নাম হচ্ছে বিধবা। বিশেষ করে দরিদ্র, নিঃস্ব, অবহেলিত বিধবা নারী। এমন বিধবাকে সাহায্য-সহযোগিতা করাকে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইবাদততুল্য নেকির কাজ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি বিধবা ও মিসকিনের সমস্যা সমাধানের জন্য ছোটাছুটি করে সে যেন আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে লিপ্ত। বর্ণনাকারী বলেন, আমার মনে হয় রাসুলুল্লাহ (সা.) এ কথাও বলেছেন, সে যেন ওই ব্যক্তির মতো যে সারা রাত সালাত আদায় করে এবং সারা বছর সিয়াম পালন করে। (বুখারি,    হাদিস : ৫৩৫৩)

নিঃস্ব ও ক্ষুধার্তকে খাবার দান : মুমিনদের বৈশিষ্ট্য হলো তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে নিঃস্ব-দরিদ্র, এতিম ও কারাবন্দিদের খাদ্য দান করে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা আল্লাহর মহব্বতে অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দিদের খাবার দেয়। (তারা বলে) শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য আমরা তোমাদের খাদ্য দান করি। আর আমরা তোমাদের কাছ থেকে কোনো প্রতিদান ও কৃতজ্ঞতা কামনা করি না। ’ (সুরা : দাহর, আয়াত : ৮-৯)

অভাবীদের খাদ্য দান না করা জাহান্নামিদের বৈশিষ্ট্য। জান্নাতিরা জাহান্নামিদের জিজ্ঞেস করবে, ‘‘কোন বস্তু তোমাদের ‘সাকারে’ (জাহান্নামে) প্রবেশ করাল? তারা বলবে, আমরা মুসল্লিদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না। আমরা অভাবগ্রস্তকে খাবার দিতাম না। ’’ (সুরা : মুদ্দাসসির, আয়াত : ৪২-৪৪)

রোগীর সেবা : রোগীর সেবার গুরুত্ব সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো ব্যক্তি যখন রোগীকে সেবা করে বা দেখতে যায়, তখন সে জান্নাতের উদ্যানে ফল আহরণ করতে থাকে। বলা হলো, হে রাসুল (সা.)! ‘খুরফা’ কী? তিনি বলেন, জান্নাতের ফল। (মুসলিম, হাদিস : ২৫৬৮; তিরমিজি, হাদিস : ৯৬৮)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যখন কোনো মুসলিম তার কোনো ভাইয়ের রোগ দেখতে যায় অথবা সাক্ষাৎ করতে যায়, তখন আল্লাহ বলেন, তোমার জীবন সুখের হলো, তোমার চলন উত্তম হলো এবং তুমি জান্নাতে একটি ইমারত বানিয়ে নিলে। (তিরমিজি, হাদিস : ২০০৮)

প্রতিবেশীর হক আদায় : আত্মীয়-স্বজনের পর প্রতিবেশী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জিবরাঈল (আ.) সদা-সর্বদা আমাকে প্রতিবেশীর অধিকার পূর্ণ করার উপদেশ দিতেন। এমনকি আমার মনে হচ্ছিল যে তিনি প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেবেন। (বুখারি, হাদিস : ৫৬৬৯)

প্রতিবেশীকে অভুক্ত রেখে যে ব্যক্তি পেটপুরে খায় সে প্রকৃত মুমিন নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ওই ব্যক্তি ঈমানদার নয়, যে ব্যক্তি তৃপ্তিসহকারে পেটপুরে খায়, অথচ তার পাশেই তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে। (সহিহ আত-তারগিব, হাদিস : ২৫৬১; বায়হাকি, হাদিস : ২০১৬০)

কর্জে হাসান বা উত্তম ঋণ : আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কর্জে হাসানের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। চির অভিশপ্ত সুদি কারবারকে প্রতিহত করতে হলে কর্জে হাসানের বিকল্প নেই। সামাজিক দৈন্য, পারিবারিক কলহসহ নানা অসংগতি দূরীকরণে কর্জে হাসান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর মাধ্যমে পরস্পরের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ়করণ, দারিদ্র্য বিমোচন, ধনী-দরিদ্রের বিভেদ সহজেই দূর করা সম্ভব। কাউকে ঋণ দেওয়া সদকার সমান সওয়াবের কাজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যদি কোনো মুসলিম ব্যক্তি তার অন্য কোনো মুসলিম ভাইকে দুইবার ঋণ দান করে তাহলে তার আমলনামায় এ অর্থ একবার সদকা করার মতো হবে। (ইবনু মাজাহ, হাদিস : ২৪৩০)

ত্রাণ বিতরণ : ধনী-গরিব-নির্বিশেষে মানুষ দুর্যোগে নিপতিত হয়ে সাময়িক বা স্থায়ীভাবে নিঃস্ব হতে পারে। যেমন—ঘূর্ণিঝড়, সাইক্লোন, বন্যা, নদীভাঙনসহ যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা যেকোনো সংকটময় অবস্থায় অসহায় মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসার জন্য আহবান জানিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়ার বিপদসমূহের কোনো একটি বিপদ দূর করে দেবে, আল্লাহ তার আখিরাতের বিপদসমূহের মধ্য থেকে একটি (কঠিন) বিপদ দূর করে দেবেন। (বুখারি, হাদিস : ২৪৪২; মুসলিম, হাদিস : ২৫৮০)

শরণার্থীদের আশ্রয় দান : মুহাজিরদের আশ্রয়দানকারী আনসারদের প্রশংসায় মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর যারা মুহাজিরদের আগমনের আগে এ নগরীতে বসবাস করত এবং ঈমান এনেছিল। যারা মুহাজিরদের ভালোবাসে এবং তাদের (ফাই থেকে) যা দেওয়া হয়েছে, তাতে তারা নিজেদের মনে কোনোরূপ আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে না। আর তারা নিজেদের ওপর তাদের অগ্রাধিকার দেয়, যদিও তাদের আছে অভাব। আসলে যারা হৃদয়ের কার্পণ্য থেকে মুক্ত, তারাই সফলকাম। ’ (সুরা : হাশর, আয়াত : ৯)

তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত সমাজকল্যাণমূলক কাজে আত্মনিয়োগ করে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা এবং জান্নাত লাভের পথ সুগম করা। মহান আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন।

একে  আরিফ/

Leave a Reply

Your email address will not be published.

More News Of This Category