শুরু হচ্ছে গণিতের বিশ্বকাপ

কালের সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: ক্রিকেট বিশ্বকাপ শেষ হচ্ছে ১৪ জুলাই। আর সেদিনই ‘গণিতের বিশ্বকাপে’ অংশ নিতে বাংলাদেশ থেকে রওনা হবে ৬ কিশোর। ইংল্যান্ডের বাথ শহরে শুরু হচ্ছে আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াড (আইএমও), ১১৬ টি দেশের ৬০০ প্রতিযোগী অংশ নেবে সেখানে।

‘বাংলাদেশ…বাংলাদেশ…বাংলাদেশ’—গ্যালারি ভর্তি দর্শকের এই চিৎকার শোনা যায় ক্রিকেট বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রতিটি ম্যাচে। আরেক বিশ্বকাপের মঞ্চে এমন চিৎকার না থাকলেও সেখানে বাংলাদেশে দলের অর্জিত পদকের সংখ্যা কিন্তু কম নয়। গত বছরের স্বর্ণপদক মিলিয়ে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের ঝুলিতে এসেছে ২৯টি পদক।

ইংল্যান্ডের বাথ শহরের মাটিতে আগামী ১১ জুলাই থেকে শুরু হবে আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের ৬০তম আয়োজন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ১১৬টি দেশের প্রায় ৬০০ প্রতিযোগী অংশ নেবে এ আয়োজনে। মূলত কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের গণিতে দক্ষতা যাচাই এবং সারা বিশ্ব থেকে গণিতে মেধাবীদের খুঁজে বের করা এ আয়োজনের লক্ষ্য। ২০০৫ সালে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক এ আয়োজনে অংশ নেয় বাংলাদেশ দল।

ডাচ্​–বাংলা ব্যাংক ও প্রথম আলোর পৃষ্ঠপোষকতায় সারা দেশে আয়োজন করা হয় গণিত উৎসব। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে গণিতে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের খুঁজে আনতে এ বছর প্রতিটি জেলায় ও দুটি উপজেলায় বাছাই পর্বের আয়োজন করা হয়। এ পর্বের সেরাদের নিয়ে ১২টি আঞ্চলিক উৎসবের আয়োজন করা হয়। এসব উৎসব থেকে নির্বাচিত ১ হাজার ৩০০ জনকে নিয়ে ঢাকায় দুই দিনব্যাপী গণিত উৎসবের জাতীয় পর্বের আয়োজন করে বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি। দিনব্যাপী নানা আয়োজন, গণিত অলিম্পিয়াড আর শিক্ষার্থীদের নানা প্রশ্নোত্তরের মধ্য দিয়ে চলে এ আয়োজন। জাতীয় পর্বে বিজয়ী ৪০ জন অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে ঢাকায় শুরু হয় জাতীয় গণিত ক্যাম্প। ক্যাম্পের বাছাই পরীক্ষা, টিম ফাইনাল টেস্টের মতো জটিল পথ পাড়ি দিয়ে আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের জন্য দল বাছাই করে বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি।

এ দলে থাকার সুযোগ পেয়েছে ঢাকার এসওএস হারম্যান মেইনার কলেজের এম আহসান আল মাহীর, ফরিদপুরের সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের সৌমিত্র দাস, ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের আহমেদ ইত্তিহাদ হাসিব, ময়মনসিংহ জিলা স্কুলের মো. মারুফ হাসান রুবাব, ঢাকার সেন্ট যোসেফ উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দেওয়ান সাদমান হাসান এবং ঢাকার নটর ডেম কলেজের মাশরুর হাসান ভুঁইয়া। এদের মধ্যে সৌমিত্র দাস গত বছর আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে বিশেষ সম্মাননা পদক পেলেও বাকি সবার জন্য এ আয়োজন একেবারেই নতুন। নতুনদের নিয়েই আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে রওনা হবে বাংলাদেশ দল, আগামী ১৪ জুলাই। দলটির নেতৃত্ব দেবেন কোচ মাহবুব মজুমদার।

দলের ছয় সদস্য সম্প্রতি এসেছিল প্রথম আলো কার্যালয়ে। হাসি–আড্ডার নানা কথায় জানা যায় তাদের এই পথচলার গল্প। খুদে এই গণিতবিদেরা মোটেও গম্ভীর, রাশভারী মানুষ নয়। বরং নিজেদের প্রাণবন্ত জীবনে গণিত নিয়েই আনন্দ খুঁজে পায় তারা। ফরিদপুরের ছোট্ট শহরে স্বপ্ন শুরু হয় সৌমিত্র দাসের। ছোটবেলা থেকেই গণিত ভালো লাগত। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে গণিত উৎসবের আঞ্চলিক পর্বে অংশগ্রহণ করে সে। এরপর নিজের চেষ্টায় একে একে বিভাগীয় ও জাতীয় পর্ব পেরিয়ে ক্যাম্পে আসার সুযোগ পায়। ২০১৫ সালে প্রথমবারের মতো জাতীয় ক্যাম্পে অংশ নেয় সৌমিত্র। গত বছর আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে বিশেষ সম্মাননা পদক পায় সে। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এ বছর দেশের জন্য ভালো কিছু বয়ে আানার প্রত্যয় সৌমিত্রের।

অন্যদিকে গোটা দলকে মাতিয়ে রাখে আহমেদ ইত্তিহাদ হাসিব। ‘গণিত কেন ভালো লাগে?’—এ প্রশ্নের উত্তরে সোজাসাপ্টা বলে দেয়, ‘আমি গণিতে আনন্দ পাই।’ অন্য সবার মতোই আঞ্চলিক, জাতীয় উৎসব আর ক্যাম্প পেরিয়ে এই দলে আসার সুযোগ পেয়েছে সে। যেকোনো প্রশ্নের উত্তরে মাথা ঝাঁকিয়ে গণিতবিদের মতো যুক্তি–বুদ্ধিতে উত্তর করে হাসিব। একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি গণিত অলিম্পিয়াড করতে সমস্যা হয় কি না, জানতে চাইলে সে বলে, ‘এটা সম্পূর্ণ নিজের ওপর। নিয়মিত পড়াশোনা করলে পরীক্ষার আগে কোনো চাপ থাকে না।’ এ বছরের এশিয়ান প্যাসিফিক গণিত অলিম্পিয়াডে ব্রোঞ্জপদক পেয়েছে সে। সামনের আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডেও এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে চায় হাসিব।

আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে ইংল্যান্ডে যাচ্ছেন এই ছয় কিশোর। আশরাফুল আলমদলে নতুন হয়েও বেশ গুছিয়ে দলকে উপস্থিত করতে জুড়ি নেই এম আহসান-আল-মাহীরের। গণিত উৎসবের সঙ্গে পথচলার শুরুতে ‘প্রাইমারি ক্যাটাগরি’ পর্যায়ে সেরাদের সেরা হয় সে। তবে ‘জুনিয়র ক্যাটাগরিতে’ সে সুবিধা করতে পারছিল না। নিজেই নিজের দিকে এরপর চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় মাহীর। নিজের অক্লান্ত পরিশ্রম আর অধ্যবসায়কে কাজে লাগিয়ে জাতীয় দলে জায়গা করে নিয়েছে ছেলেটি। গণিত অলিম্পিয়াডে ভালো করার উপায় জানতে চাইলে মাহীর জানায়, ‘হাল ছেড়ে দেওয়া চলবে না। একবার অংশ নিয়েই যদি কেউ ভাবে যে সে সেরাদের কাতারে আসতে পারবে, তাহলে সেটা ভুল। বরং বারবার নিজের পরাজয় থেকে শিখে নতুন করে নিজেকে তৈরি করতে হবে। অধ্যবসায় কাজে লাগিয়ে গণিত চর্চা করতে হবে। তাহলেই সামনে এগোনো সম্ভব।’ ইতিমধ্যে এশিয়ান প্যাসিফিক গণিত অলিম্পিয়াডে রৌপ্যপদক পেয়েছে মাহীর। ভবিষ্যতে কম্পিউটার প্রকৌশল নিয়ে পড়াশোনা করার ইচ্ছে তার।

প্রাণবন্ত এই গণিতবিদদের দল শুধু সারা দিন গণিত করে, তা কিন্তু নয়। গেমিংয়ে বেশ আগ্রহ তাদের সবারই। ওদের মধ্যে অবশ্য গেমিং নিয়ে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ দেওয়ান সাদমান হাসানের। তাই বলে পড়াশোনায় পিছিয়ে নেই সে। এসএসসি পরীক্ষার পাশাপাশিও গণিত অলিম্পিয়াডের জাতীয় দলের ক্যাম্পে সময় দিয়েছে সে। ২০১৫ সাল থেকে জুনিয়র ক্যাটাগরির হয়ে ক্যাম্পে থাকার সুযোগ পেয়েছে দেওয়ান। ক্যাম্পের সিনিয়র ক্যাটাগরির ভাইয়াদের দেখে আরও ভালো করার অনুপ্রেরণা পেয়েছে। তার ঝুলিতেও উঠে এসেছে এশিয়ান প্যাসিফিক গণিত অলিম্পিয়াডে রৌপ্যপদক। তাই সামনের আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে এই সাফল্যের ধারা ধরে রাখতে চায় সে।

কয়েক দফা ক্যাম্প, বাছাই পরীক্ষা আর যাচাই–বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত হয়েছে এই দল। গণিতের বিশ্বকাপের ফলাফল কেমন হবে, সেই প্রশ্নে আশার কথাই শোনা গেল। এই বিশ্বকাপের ফলাফল জানতে চোখ রাখতে হবে ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব বাথের মঞ্চে। হয়তো এবার এই মঞ্চেও কানে ভেসে আসবে ‘বাংলাদেশ…বাংলাদেশ…বাংলাদেশ’। সূত্র: প্রথম আলো

এম কে ইসলাম/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category