বেড়েছে সাপের উপদ্রপ ; মহাদেবপুর হাসপাতালে নেই সাপের বিষের ভ্যাকসিন

মোঃ এমদাদুল হক দুলু,(বদলগাছী,নওগাঁ): নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিষাক্ত সাপে কাটা রোগীদের জীবন রক্ষাকারী ইনজেকশন এন্টিভেনম নেই। ভ্যাকসিন (অ্যান্টি স্নেক ভেনম) সরবরাহ বন্ধ থাকায় দূরদূরান্ত থেকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা চিকিৎসা পাচ্ছে না। ফলে সাপে কাটা রোগীদের নিয়ে উপজেলাবাসীকে আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে। জরুরি প্রয়োজনে টাকা দিয়ে কেনার উপায় নেই, কারণ ওষুধের দোকানগুলোতে এ ভ্যাকসিন রাখা হয় না।

আবার স্থানীয় বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকেও এই ভ্যাকসিন পাওয়া যায় না। সাপে কাটা রোগীদের চিকিৎসার জন্য রাজশাহী যেতে হয়। মহাদেবপুর থেকে সড়কপথে রাজশাহীর দূরত্ব ৮১ কিলোমিটার। পথে যেতে অনেক সময় যানজটের কবলে পড়তে হয়। অন্যত্র স্থানান্তর করতে গিয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে অহরহ।

এমনকি ভ্যাকসিন পুশ করার জন্য যে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের প্রয়োজন, সেটাও নেই। এন্টিভেনম পুশ করার পর রোগীর অবস্থার অবনতি হতে থাকলে তাকে আইসিইউতে নিতে হয়। এ ব্যবস্থা নেই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। অর্থাৎ, ইনজেকশন দেওয়ার পর রোগীর শরীরে যে ইফেক্ট পড়বে, তা মোকাবেলা করার সাধ্য উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসকদের পক্ষে সম্ভব নয়।

সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার “সাপের কামড় প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক কৌশলপত্রে” বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বছরে সাপের কামড়ের শিকার হয় ৫ লাখ ৮৯ হাজার ৯১৯ জন। আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে বছরে মারা যায় ৬ হাজার ৪১ জন। অথচ উপজেলা পর্যায়ে দেশের উত্তরাঞ্চলের বেশির ভাগ সরকারি হাসপাতালে সাপের বিষক্ষয়ের ওষুধ (এন্টিভেনম) নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বছরে বিশ্বব্যাপী ৭৯ হাজার মানুষ সাপের কামড়ে মারা যায়। অন্যদিকে প্রায় ৪ লাখ মানুষ সাপের কামড়ের কারণে অন্ধত্বসহ নানা ধরনের প্রতিবন্ধিতার শিকার হয়।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলেছেন, সাপের বিষক্ষয়ের ওষুধের কিছু পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া আছে। যেমন ইনজেকশন প্রয়োগের পর আক্রান্ত ব্যক্তিদের অনেকের তীব্র শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। তখন পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবেন কি না, এই আশঙ্কায় কিছু চিকিৎসক সাপের বিষক্রিয়ার চিকিৎসা করতে চান না। গ্রামে সাপের কামড়ের ঘটনা বেশি ঘটলেও সেখানে চিকিৎসার সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত।

যে কারণে সাপের কামড়জনিত অসুস্থতা ও মৃত্যুর হার শহরের তুলনায় গ্রামে অনেক বেশি। কুসংস্কারের কারণে সাপের কামড়ের শিকার অনেকে প্রথমে চিকিৎসকের কাছে যান না। তার পরিবর্তে ঝাড়ফুঁক ও কবিরাজের শরণাপন্ন হন। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না পেলে সাপে কাটা ব্যক্তির জীবন হুমকির মুখে পড়ে যায়। সাপে আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকেরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাপের কামড়ে সম্প্রতি উপজেলার চাঁন্দাশ ইউনিয়নের রামচরণপুর গ্রমের বেলাল হোসেন (২৭) ও তার স্ত্রী মৌসুমী আক্তারের (২২) মৃত্যু হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে এসে ভ্যাকসিনের (অ্যান্টি স্নেক ভেনম) অভাবে তাঁরা চিকিৎসাসেবা পাননি। গত ১০ অক্টোবর বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ২ টার দিকে বেলাল ও মৌসুমি ঘরে খাটের ওপর ঘুমিয়ে ছিলেন। মশারির ভেতরে ঢুকে একটি সাপ তাদের দুজনকেই কামড় দেয়।

এরপর তাদের ঘুম ভেঙে গেলে তারা দেখেন, বিছানার ওপর একটি সাপ। পরে মাছ ধরা জাল দিয়ে সাপটিকে ধরা হয়। এরপর তাদের দুজনকেই মহাদেবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু সেখানে সাপে কাটার কোনো ওষুধ না থাকার কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। শুক্রবার ভোর ৬ টায় তাদের সেখানে ভর্তি করা হয়। বেলাল হাসপাতালের ৪২ ও মৌসুমিকে ৪৯ নম্বর ওয়ার্ডে রেখে এন্টিভেনম প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু সকাল ৯ টার দিকে রামেক হাসপাতালে দুজনই মারা যায়।

রামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক বেলাল হোসেন জানান, সাপটির নাম ‘কমন ক্র্যাট’। এই সাপ ফনা তোলে না। কিন্তু গোখরার চেয়ে চারগুণ বেশি বিষধর। বালতিতে করে জালে জড়িয়ে আনা সাপটি দেখার পর তিনি এটিকে মেরে পুঁতে ফেলার নির্দেশ দেন।বেলালের চাচা আবদুর রহিম বলেন, এ ঘটনার ২৯ দিন আগে নূরের বাবা সিরাজুল ইসলামেরও মৃত্যু হয়েছে সাপে কেটে। বাড়িতে সাপে কাটার পর তাকে হাসপাতালে নেয়ারও সময় পাওয়া যায়নি।

বেলাল ও মৌসুমিকে হাসপাতালে নেয়া হলেও বাঁচানো গেল না। রহিম আরো বলেন, মহাদেবপুর হাসপাতালে সাপে কাটার ওষুধ নেই।সেখানে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দিলে হয়তো তাদের বাঁচানো যেত। রামেক হাসপাতালের চিকিৎসক বেলাল হোসেনও একই কথা বলছেন। তিনি বলেন, মহাদেবপুর থেকে রামেক হাসপাতালের দূরত্ব প্রায় ৮১ কিলোমিটার। কমপক্ষে দুই ঘণ্টার পথ। এই দুই ঘণ্টা আগে যদি বেলাল ও মৌসুমিকে এন্টিভেনম প্রয়োগ করা যেত তাহলে তাদের প্রাণরক্ষার সম্ভাবনা ছিলো।

এ ব্যাপারে মহাদেবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আখতারুজ্জামান আলাল বলেন, উপজেলা পর্যায়ে সাপে কাটা রোগীদের জন্য এন্টিভেনমের সরবরাহ নেই।আর এন্টিভেনম ছাড়া সাপে কাটা রোগীর প্রাথমিক চিকিৎসাও হয় না। তাই হাসপাতালে সাপে কাটা রোগী এলে রাজশাহী পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এতে অনেকেরই জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে। তবে এন্টিভেনম ও অভিজ্ঞ চিকিৎসক সরবরাহের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জরুরিভিত্তিতে জানানো হবে।

 

 

এস ইসলাম/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category