Monday, January 18th, 2021




বাংলার সন্তান নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও বেগম লুৎফুন্নিসার প্রতি নেতাজীর শ্রদ্ধাঞ্জলি

বাংলার সন্তান নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও বেগম লুৎফুন্নিসার প্রতি নেতাজীর শ্রদ্ধাঞ্জলি

নবাবজাদা আলি আব্বাসউদ্দৌলা: সুভাষচন্দ্র বসু (জন্ম: ২৩ জানুয়ারি, ১৮৯৭) ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক কিংবদন্তি নেতা। তিনি নেতাজি নামে সমধিক পরিচিত।সুভাষচন্দ্র পরপর দুইবার ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে আদর্শগত সংঘাতের জন্য তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়। সুভাষচন্দ্রফরওয়ার্ড ব্লক নামক একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করে ব্রিটিশ শাসন থেকে ভারতের পূর্ণ ও সত্বর স্বাধীনতার দাবি জানাতে থাকেন। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তাঁকে এগারো বার কারারুদ্ধ করেছিল। তাঁর বিখ্যাত উক্তি “তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেবো।” তাঁর আর একটি বিখ্যাত উক্তি হল “ভারতের জয় (“জয় হিন্দ”), যা কিনা পরবর্তীতে ভারত সরকার গ্রহণ করে নেয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘোষিত হওয়ার পরেও তাঁর মতাদর্শের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি; বরং এই যুদ্ধকে ব্রিটিশদের দুর্বলতার সুবিধা আদায়ের একটি সুযোগ হিসেবে দেখেন। যুদ্ধের সূচনালগ্নে তিনি লুকিয়ে ভারত ত্যাগ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন, জার্মানি ও জাপান ভ্রমণ করে ভারতে ব্রিটিশদের আক্রমণ করার জন্য সহযোগিতা লাভের উদ্দেশ্যে। জাপানিদের সহযোগিতায় তিনি আজাদ হিন্দ ফৌজ পুনর্গঠন করেন এবং পরে তার নেতৃত্ব দান করেন। এই বাহিনী সৈনিকেরা ছিলেন মূলত ভারতীয় যুদ্ধবন্দী এবং ব্রিটিশ মালয়, সিঙ্গাপুর সহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলে কর্মরত মজুর। জাপানের আর্থিক, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিক সহায়তায় তিনি নির্বাসিত আজাদ হিন্দ সরকার প্রতিষ্ঠা করেন এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের নেতৃত্বদান করে ব্রিটিশ মিত্রবাহিনীর বিরুদ্ধে ইম্ফল ও ব্রহ্মদেশে যুদ্ধ পরিচালনা করেন।ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে নাৎসি ও অন্যান্য যুদ্ধবাদী শক্তিগুলির সঙ্গে মিত্রতা স্থাপনের জন্য কোনো কোনো ঐতিহাসিক ও রাজনীতিবিদ সুভাষচন্দ্রের সমালোচনা করেছেন; এমনকি কেউ কেউ তাঁকে নাৎসি মতাদর্শের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন বলে অভিযুক্ত করেছেন। তবে ভারতে অন্যান্যরা তাঁর ইস্তাহারকে রিয়েলপোলিটিক (নৈতিক বা আদর্শভিত্তিক রাজনীতির বদলে ব্যবহারিক রাজনীতি)-এর নিদর্শন বলে উল্লেখ করে তাঁর পথপ্রদর্শক সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাবাদর্শের প্রতি সহানুভূতি পোষণ করেছেন।উল্লেখ্য, কংগ্রেস কমিটি যেখানে ভারতের অধিরাজ্য মর্যাদা বা ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাসের পক্ষে মত প্রদান করে, সেখানে সুভাষচন্দ্রই প্রথম ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার পক্ষে মত দেন। জওহরলাল নেহরু সহ অন্যান্য যুবনেতারা তাঁকে সমর্থন করেন। শেষপর্যন্ত জাতীয় কংগ্রেসের ঐতিহাসিক লাহোর অধিবেশনে কংগ্রস পূর্ণ স্বরাজ মতবাদ গ্রহণে বাধ্য হয়। ভগৎ সিংহের ফাঁসি ও তাঁর জীবন রক্ষায় কংগ্রেস নেতাদের ব্যর্থতায় ক্ষুব্ধ সুভাষচন্দ্র গান্ধী-আরউইন চুক্তি বিরোধী একটি আন্দোলন শুরু করেন। তাঁকে কারারুদ্ধ করে ভারত থেকে নির্বাসিত করা হয়। নিষেধাজ্ঞা ভেঙে তিনি ভারতে ফিরে এলে আবার তাঁকে কারারুদ্ধ করা হয়।সচেতন ইতিহাসবিদেরা মনে করেন ১৯৪৫ সালে মৌলোবাদি হিন্দুদের চক্রান্তে তাঁর করুণ মৃত্যু হয়। তাঁকে মারবারষড়যন্ত্রমূলক দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর নিয়ে অনেকের কাছে প্রমাণও বিদ্যমান ছিল, যা কট্টরপন্থী হিন্দুরা পুড়িয়ে দেয়!!!!

*বাংলার সন্তান বীর দেশ প্রেমিকনবাব সিরাজউদ্দৌলার ভালোবাসায়নেতাজী সুভাষচন্দ্রবসু-অন্ধকূপ বা ব্ল্যাকহোল মনুমেন্ট পুননির্মাণের সময়েই বাংলার মানুষেরা লর্ড কার্জনের এ কাজের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল।নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ার অনেক আগেই ভারতীয় সংবাদপত্র গুলো এই নির্মাণের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করে এবং তদের দাবি তুলে ধরে। তদানীন্তন প্রকাশিত ‘ দি বেঙ্গলি ‘ পত্রিকা দাবি করল, প্রস্তাবিত ফলক এমন একটি ঘটনার সৃতি জাগিয়ে তুলবে, যা ওখানেই সমাহিত করা উচিত। তাঁদের মতে ব্ল্যাকহোল ট্রাজেডি হচ্ছে একটি কল্পকাহিনী, জলজ্যান্ত মিথ্যা ও ইতিহাস জালিয়াতি। কোনো বিরোধিতাই কার্জন গ্রাহ্যে আনেননি। ব্ল্যাকহোল মনুমেন্ট স্থাপন প্রথম থেকে বাঙালীরা যে বিরোধিতা করেছিল তা পরবর্তী সময়ে জাতীয় চেতনায় অনুপ্রাণিত প্রজন্মের মধ্যে তীব্র আকার ধারন করে। ১৯৪০ সালে নেতাজী সুভাষচন্দ্রবসু এই মনুমেন্ট অপসরণের দাবি করে বলেছিলেন- ‘ এটিই বীর দেশপ্রেমিক নবাব সিরাজউদ্দৌলার সৃতিতে একটি ভিত্তিহীন কালিমাই শুধু নয়, বরং দেড়শ বা ততোধিক বছর ধরে আমাদের দাসত্ব আর অপমানের প্রতীক হয়ে কোলকাতার মধ্যে দাড়িয়ে আছে।‘ আর তাই ইতিহাসের নিয়মেই ভারতের স্বাধীনতার পর ব্ল্যাকহোল মনুমেন্টটি তার আগের স্থান থেকে অপসারিত হলো।

খ্যাতনামা নাট্যকার- কবি- সাহিত্যিক- মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও দৈনিক ইত্তিফাকের সহযোগী সম্পাদক সিকান্দার আবু জাফরের মতে- ইংরেজদের সুপরিকল্পিত আন্তর্জাতিক প্রচারণায় অবিসংবাদী সত্য হিসেবে গৃহীত সিরাজউদ্দৌলার বর্বরতার সবচেয়ে ভয়াবহ দৃষ্টান্ত অন্ধকূপ হত্যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে। অনুরুপ হত্যার স্মারক স্তম্ভ হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণে রাজনৈতিক নেতা সুভাষচন্দ্র বসুর বেক্তিগত প্রচেষ্টা, ছেনি হাতুড়ি নিয়ে কলঙ্ক স্তম্ভটি চূর্ণ করবার জন্য তাঁর প্রত্যক্ষ আত্মনিয়োগের আমি চাক্ষুস সাক্ষী। (সাপ্তাহিক পলাশী-২৩ জুন ২০০৮, পৃষ্ঠা : ১১)।

অন্ধকূপ হত্যার মতো কল্পকাহিনী বাংলার মানুষকে পৌনে ২০০ বছর ধরে বিশ্বাস করানো হয়েছে। অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়ের চুল চেরা বিশ্লেষণে অন্ধকূপ হত্যার কাহিনী সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয় এবং ১৯৪০ সালে নেতাজী সুভাষচন্দ্রবসুর নেত্ত্রিত্তে বাংলার প্রধানমন্ত্রী শের- এ- বাংলা- এ কে ফজলুল হকের উপস্থিতিতে সেদিনকার হিন্দু-মুসলমান ছাত্র সমাজ সংগ্রাম করে কোলকাতার বুক থেকে কথিত অন্ধকূপ হত্যার সৃতি চিহ্ন হলওয়েল মনুমেন্ট উপড়ে ফেলে। পলাশী দিবস বাংলায় প্রথম যথাযথ মর্যাদায় পালনের উদ্যোগ নেন নেতাজী সুভাষচন্দ্রবসু। তাঁর সঙ্গে ছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম, দৈনিক আজাদের সম্পাদক মওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ ও অন্য প্রগতিশীল বিপ্লবীরা। উক্ত সময় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এক বিবৃতিতে বলেন- “নেতাজী সুভাষচন্দ্রবসু ও মওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁর নেতৃতে কলিকাতায় সিরাজউদ্দৌলা সৃতি কমিটি উক্ত অনুষ্ঠানকে সাফল্য মণ্ডিত করিবার জন্য আপ্রান চেষ্টা করিতেছেন। কলিকাতা কমিটিকে সর্ব প্রকার সাহায্য সহযোগিতা প্রদান করিয়া আমাদের জাতীয় বীরের সৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করিবার জন্য আমি জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকলের নিকট আবেদন জানাইতেছি। বিদেশীর বন্ধন শৃঙ্খল হইতে মুক্তিলাভের জন্য আজ আমরা সংগ্রাম রত। বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার বীর দেশপ্রেমিক জীবন সৃতি হইতে যেন আমরা অনুপ্রাণিত হই। ইহাই আমার প্রার্থনা “।

ইতিহাস ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক রিজভি খান বলেন, নেতা জিসুভাস চন্দ্রবসু বলেছিলেন- নবাবসিরাজউদ্দৌলা বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার্থে যে আত্মত্যাগ করে ছিলেন।তার জন্য নবাবের জন্মদিনকে (১৭২৭ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর) সিরাজ দিবস ঘোষণা করা উচিত।বাংলাদেশে সত্যিকার অর্থেই এই কাজটা করা উচিৎ।

ইতিহাস ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডিউক হুদা বলেন,নেতাজিসুভাসচন্দ্রবসুবীর দেশপ্রেমী বাংলার সন্তান নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও তাঁর সহধর্মিণী বেগম লুৎফুন্নিসার সমাধি পরিদর্শন কালে সদ্য প্রস্ফুটিত ফুল ও স্যালুট দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। কবি মঈন কবির বলেন,মুর্শিদাবাদ ‘খোশবাগে’ নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোসের মূর্তি রাখা হয়েছে, নবাবের ঘর কিন্তু নবাবের ছবি তার পাশে নেই! এসব কূট চাল চেলে কট্টর হিন্দুরা কি মজা পায়,তা আমি বুঝি না।”শিক্ষা ইতিহাস ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরুহুল আমিন মুন্নু বলেন, সকলধর্মেরপ্রতিশ্রদ্ধাশীলহিন্দু ধর্মাবলম্বী নেতাজী সুভাস চন্দ্র বলেন- অন্যের ক্ষতি চাইলে নিজের পতন নিশ্চিত।ন্যাশনাল এ্যাওয়ার্ড প্রাপ্ত বাংলা ভাষায় নির্মিত পিয়ুস বাসু পরিচালিত ,১৯৬৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত-“সুভাষ চন্দ্র“ ( আশীষ ঘোষ, সমর কুমার, অমর দত্ত,রবিন ব্যানারজী অভিনীত। প্রযেজক- অজিত কুমার ব্যানারজী। সংগীত- অপারেশ লাহেরি) -চলচ্চিত্রটি ব্যাতিতো, ভারতে তাদের দ্বারা নির্মিত অধিকাংশ চলচ্চিত্র ও নাটকে নবাব আলিবর্দীখান, নবাব সিরাজউদ্দৌলা, বেগম লুৎফুন্নিসা সহ প্রকৃত দেশপ্রেমি ও সৎ মুসলিম বেক্তিকে অতি নৈপুণ্যতায় খল চরিত্রে তুলে ধরা হয়। যা তাদের ধর্মীয় কল্পকাহিনীর অংশ ছাড়া আর কিছু নয়।রাজনীতিবিদ নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, ইতিহাসবিদ ড.মোহাম্মদমোহরআলী, রাজনীতিবিদ শের – এ – বাংলা এ.কে. ফজলুল হক,নবাবসিরাজউদ্দৌলাচলচ্চিত্রেরচিত্রনাট্যকারমরহুমখানআতাউররহমানওস্বীকারকরেছেনযে, আলেয়া/রাজকুয়ার/ মাধবী / হিরা / ফৈজিবাঈচরিত্র গুলোরকোনবাস্তবতানেই, এগুলোচিত্রনাট্যেরপ্রয়োজনেসৃষ্টিকরাহয়েছে এবং তাঁরা এও বলেন বাস্তবে নবাব সিরাজউদ্দৌলার একটি মাত্র সন্তান ছিল- তাঁর নাম ‘উম্মে জোহরা’।নাট্যকারসিকান্দারআবুজাফর, নাট্যকার আসকার ইবনে শাইখ,প্রখ্যাত শিল্পী নেজামত উল্লাহ, মিডিয়া বেক্তিত্ত ফজলে লোহানী, কবি রেদওয়ানুল হক, ড. মুহাম্মদ ফজলুল হক ( শিল্পপতি,শিক্ষাবিদ ও নবাব সিরাজউদ্দৌলা গবেষক, রাজনীতিবিদ – বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ ), ড. রমিত আজাদ (শিক্ষাবিদ ও নবাব সিরাজউদ্দৌলা গবেষক ), ড. আবদুল লতিফ মাসুম (শিক্ষাবিদ ও নবাব সিরাজউদ্দৌলা গবেষক),ড. এমাজ উদ্দিন (শিক্ষাবিদ ও নবাব সিরাজউদ্দৌলা গবেষক), ইতিহাসবিদ ডিউক হুদা,জনাব মিজানুর রহমান চৌধুরি ( সম্পাদক- দৈনিক আমাদের বাংলা),সিনিয়র সাংবাদিক মাহমুদ আল ফয়সাল, সাংবাদিক মোহাম্মদ মামুনুর রশিদ, ইতিহাসবিদ ড. কে. এম. মোহসীন, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসাইন মোঃ এরশাদের ডেপুটি প্রেস সচিব জনাব খন্দকার দেলোয়ার জালালি, ইতিহাসবিদড. শেখ আকরাম আলী,ইতিহাসবিদ ড.শরিফ উল্লাহ ভূঁইয়া,বুদ্ধিজীবী আ. শ. ম. বাবর আলী, বুদ্ধিজীবী আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া, বুদ্ধিজীবী মোফাজ্জল হোসেন, বুদ্ধিজীবী হারুনুর রশিদ,Group ক্যাপ্টেন (অব.) এম. কামাল উদ্দিন, মেজর(অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহীম বীর প্রতীক, লেখক সুরজিৎ দাশ গুপ্তও লেখক সৈয়দ মাসুদ মোস্তফাও তাঁদেরকথারসাথেএকাত্মহয়েছেন।বাংলার দেশপ্রেমী মুসলিম জনতা ও প্রকৃতনবাবসিরাজউদ্দৌলা পরিবারেরসকলেইচলচ্চিত্র পরিচালক খানআতাউররহমান, ইতিহাসবিদ ড.মোহাম্মদমোহরআলী, রাজনীতিবিদ শের- এ- বাংলা এ.কে. ফজলুল হকওরাজনীতিবিদ নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর কথার সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন।

*নেতাজীর প্রথম জীবন-১৮৯৭ সালের ২৩ জানুয়ারি, বর্তমান ওড়িশা রাজ্যের কটক শহরে (ওড়িয়া বাজার) জন্মগ্রহণ করেন সুভাষচন্দ্র বসু। তিনি ছিলেন কটক-প্রবাসী বিশিষ্ট বাঙালি আইনজীবী জানকীনাথ বসু ও প্রভাবতী দেবীর চোদ্দো সন্তানের মধ্যে নবম। ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত সুভাষচন্দ্র একটি কটকের ইংরেজি স্কুলে পড়াশোনা করেন; বর্তমানে এই স্কুলটির নাম স্টিওয়ার্ট স্কুল। এরপর তাঁকে ভর্তি করা হয় কটকের রর্যাভেনশ কলেজিয়েট স্কুলে। সুভাষচন্দ্র ছিলেন মেধাবী ছাত্র। ১৯১১ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় কলকাতা থেকে প্রথম স্থান অধিকার করেন তিনি। ১৯১৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে দর্শনে সাম্মানিক সহ বি.এ. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।এরপর সুভাষচন্দ্র কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়েরফিজউইলিয়াম হলে উচ্চশিক্ষার্থে ভর্তি হন। সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় ভাল নম্বর পেয়ে তিনি প্রায় নিয়োগপত্র পেয়ে যান। কিন্তু বিপ্লব-সচেতন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সেই নিয়োগ প্রত্যাখ্যান করেন। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, “কোনো সরকারের সমাপ্তি ঘোষণা করার সর্বশ্রেষ্ঠ পন্থা হল তা থেকে [নিজেকে] প্রত্যাহার করে নেওয়া”। এই সময় অমৃতসর হত্যাকাণ্ড ও ১৯১৯ সালের দমনমূলক রাওলাট আইন ভারতীয় জাতীয়তাবাদীদের বিক্ষুদ্ধ করে তুলেছিল। ভারতে ফিরে সুভাষচন্দ্র স্বরাজ নামক সংবাদপত্রে লেখালিখি শুরু করেন এবং বঙ্গীয় প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির প্রচার দায়িত্বে নিযুক্ত হন। তাঁর রাজনৈতিক গুরু ছিলেন বাংলায় উগ্র জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ।১৯২৪ সালে দেশবন্ধু যখন কলকাতা পৌরসংস্থার মেয়র নির্বাচিত হন, তখন সুভাষচন্দ্র তাঁর অধীনে কর্মরত ছিলেন। ১৯২৫ সালে অন্যান্য জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে তাঁকেও বন্দী করা হয় এবং মান্দালয়ে নির্বাসিত করা হয়। এখানে তিনি যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়েছিলেন।সুভাষচন্দ্র ছাত্রাবস্থা থেকে তাঁর দেশপ্রেমিক সত্ত্বার জন্য পরিচিত ছিলেন।

*কর্মজীবন ও রাজনীতিতে প্রবেশ-প্রায় বিশ বছরের মধ্যে সুভাষ চন্দ্র মোট ১১ বার গ্রেফতার হয়েছিলেন তাকে ভারত ও রেঙ্গুনের বিভিন্ন জায়গায় রাখা হয়েছিল। ১৯৩০ সালে তাকে ইউরোপে নির্বাসিত করা হয়। ১৯৩৪ সালে তিনি তাঁর প্রথম প্রেম এমিলি শেঙ্কল এর সাথে পরিচিত হন ভিয়েনাতে। ১৯৩৭ সালে তারা ব্যাড গ্যাস্টিনে বিয়ে করেন।তাঁর পিতার মৃত্যুর পর ব্রিটিশ সরকার তাকে শুধু মাত্র ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের উদ্দ্যেশ কিচ্ছুক্ষণের জন্য কলকাতা আসার অনুমতি দেয়।১৯৩৮ সালে তিনি গান্ধির বিরোধীতার মুখে ভারতীয় কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৩৯ সালে তিনি দ্বিতীয়বারের জন্য ত্রিপুরা সেসনে কংগ্রেসের প্রসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এ নির্বাচনে গান্ধি পট্টভি সিতারামায়াকে সমর্থন দেন; নির্বাচনের ফলাফল শোনার পর গান্ধি বলেন “পট্টভির হার আমার হার”। কিন্তু জয়যুক্ত হলেও তিনি সুষ্ঠু ভাবে কার্য সম্পাদন করতে পারছেলেন না। গান্ধীর অনুগামীরা তার কাজে বাধা সৃষ্টি করছেলেন। গোবিন্দ বল্লভ পন্থ এইসময় একটি প্রস্তাব পেশ করেন যে, “কার্যনির্বাহক পরিষদকে পুনর্গঠন করা হোক”। এভাবে সুভাষ চন্দ্র বসু এ নির্বাচনে জয় লাভ করলেও গান্ধির বিরোধীতার ফলস্বরুপ তাকে বলা হয় পদত্যাগ পত্র পেশ করতে নইলে কার্যনির্বাহি কমিটির সকল সদস্য পদত্যাগ করবে। এ কারণে তিনি নিজেই কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করেণ এবং অল ইন্ডিয়া ফরওয়ার্ড ব্লক গঠন করেন। ১৯৩৮ সালে তিনি জাতীয় পরিকল্পনা পরিষদের প্রস্তাবনা দেন।

*দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ- সুভাষ চন্দ্র বসু প্রস্তাব করলেন, কবে ব্রিটিশরা ভারতীয়দের স্বাধীনিতার অনুমোদন দেবে তার জন্য বসে না থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে সুবিধা নেওয়া উচিত। তিনি বিশ্বাস করতেন ভারতবর্ষের স্বাধীনতা নির্ভর করে অন্য দেশের রাজনৈতিক, সামরিক ও কুটনৈতিক সমর্থনের উপর। তাই তিনি ভারতের জন্য একটি সামরিক বাহিনী গড়ে তোলার উদ্দ্যেগ গ্রহণ করেণ।ভারতবর্ষের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ গ্রহণের ব্যাপারে সুভাষ বসু নাখোশ ছিলেন। তিনি সে সময় গৃহ বন্দি ছিলেন। তিনি বুঝতে পারলেন ব্রিটিশরা তাঁকে যুদ্ধের আগে ছাড়বে না। তাই তিনি দুইটি মামলার বাকি থাকতেই আফগানিস্তান ও সোভিয়েত ইউনিয়ন হয়ে জার্মানীচলে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু আফগানিস্তানের পশতু ভাষা না জানা থাকায় তিনি ফরওয়ার্ড ব্লকের উত্তর-পশ্চিম সিমান্ত প্রদেশের নেতা মিয়া আকবর শাহকে তার সাথে নেন। যেহেতু তিনি পশতু ভাষা জানতেন না তাই তাঁর ভয় ছিল, আফগানিস্তানবাসীরা তাকে ব্রিটিশ চর ভাবতে পারে। তাই মিয়া আকবর শাহের পরামর্শে তিনি অধিবাসীদের কাছে নিজেকে একজন কালা ও বোবা বলে পরিচিত করেণ। সেখান থেকে সুভাষ বসু মস্কো গমন করেন একজন ইতালির কাউন্ট অরল্যান্ডো মাজ্জোট্টা” নামক এক নাগরিকের পরিচয়ে। মস্কো থেকে রোম হয়ে তিনি জার্মানী পৌছেন। তিনি বার্লিনে মুক্ত ভারতীয় কেন্দ্র গড়ে তোলেন। ভারতের স্বাধীনতার জন্য তিনি জার্মান চ্যান্সেলর এডলফ হিটলারের সাহায্য প্রার্থনা করেণ। কিন্তু ভারতের স্বাধীনতার ব্যাপারে হিটলারের উদাসিনতা তার মনোবল ভেঙ্গে দেয়। ফলে ১৯৪৩ সালে সুভাষ বসু জার্মান ত্যাগ করেণ। একটি জার্মান সাবমেরিন তাকে সমুদ্রের তলদেশে একটি জাপানি সাবমেরিনে পৌছিয়ে দেয়, সেখান থেকে তিনি জাপান পৌছেন।এদিকে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর বীরত্বে হিটলার-তোজো’র মতো একন্যায়তন্ত্রে বিশ্বাসীরাও তাঁর সামনে মাথা অবনত করে মৈত্রীর দিকে হাত বাড়ান। ভারতের অরবিন্দ ঘোষ, সূর্য সেন, ভগৎ সিংয়ের মতো নেতারা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নজরুলের মতো কবিরা তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হন। সমস্ত ভারতবাসীর নয়নমণি হয়ে উঠেন নেতাজী।

*ভারতীয় জাতীয় সেনাবাহিনী-ভারতীয় জাতীয় সেনাবাহিনী (ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি) মূলত গড়ে উঠেছিল জাতীয়তাবাদী নেতা রাসবিহারী বসুর হাতে, ১৯৪৩ সালে রাসবিহারি বসু এই সেনাবাহিনীর দ্বায়িত্ব সুভাষ চন্দ্র বসুকে হস্তান্তর করেণ । একটি আলাদা নারী বাহিনী (রানি লক্ষ্মীবাঈ কমব্যাট) সহ এতে প্রায় ৮৫,০০০ হাজার সৈন্য ছিল। এই বাহি্নীর কর্তৃত্ব ছিল প্রাদেশিক সরকারের হাতে, যার নাম দেওয়া হয় “মুক্ত ভারতের প্রাদেশিক সরকার” (আর্জি হুকুমত-এ-আজাদ হিন্দ)। এই সরকারের নিজস্ব মুদ্রা, আদালত ও আইন ছিল। অক্ষ শক্তির ৯ টি দেশ এই সরকারকে স্বীকৃতি দান করে। আই.এন.এ.-র সৈন্যরা জাপানিজদের আরাকান ও মেইক্টিলার যুদ্ধে সাহায্য করে।সুভাষচন্দ্র বসু আশা করেছিলেন, ব্রিটিশদের উপর আই.এন.এ.-র হামলার খবর শুনে বিপুল সংখ্যাক সৈন্য ভারতীয় সেনাবাহিনী থেকে হতাশ হয়ে আই.এন.এ.-তে যোগ দেবে। কিন্তু এই ব্যাপারটি তেমন ব্যাপকভাবে ঘটল না। বিপরীতদিকে, যুদ্ধে পরিস্থিতির অবনতির সাথে সাথে জাপান তার সৈন্যদের আই.এন.এ. থেকে সরিয়ে নিতে থাকে। একই সময় জাপান থেকে অর্থের সরবরাহ কমে যায়। অবশেষে, জাপানের আত্মস্বমর্পন এর সাথে সাথে আই.এন.এ. ও আত্মসমর্পন করে।

*নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর মৃত্যু রহস্য- আসলে ভারতবর্ষে নেতাজির তুমুল জনপ্রিয়তায় ঈর্স্বানিত হয়ে একদল উঁচুতলার ভারতীয় হিন্দু নেতা এবং ইংরেজ সরকার মিলিত ভাবে ষড়যন্ত্র করে নেতাজীকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেয়।তাই ভারতীয় সরকার কখনো নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোসের প্রকৃত মৃত্যুর কারণ জনসমক্ষে আনে নি। অনেকের মতে ফৈজাবাদের ভগবান জি ওরফে গুমনামি বাবা হলেন নেতাজি।

*সম্মাননা- আজাদ হিন্দ ফৌজের অভিযান ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলেও, সুভাষচন্দ্রের শৌর্য ও আপোষহীন রণনীতি তাঁকে ভারতব্যাপী জনপ্রিয়তা দান করে। নেতাজির জন্মদিন বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে , ত্রিপুরায় , অসমে ও ওড়িশায় লোক দেখানো রাষ্ট্রীয় ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়। স্বাধীনতার পর কলকাতার একাধিক রাস্তা তাঁর নামে নামাঙ্কিত করা হয়। বর্তমানে কলকাতার একমাত্র ইন্ডোর স্টেডিয়াম নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়াম তাঁর নামে নামাঙ্কিত। নেতাজির জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে দমদম বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তিত করে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রাখা হয়। তাঁর নামে কলকাতায় স্থাপিত হয় নেতাজি সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও নেতাজি সুভাষ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং দিল্লিতে স্থাপিত হয় নেতাজি সুভাষ ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি। কলকাতা মেট্রোর দুটি স্টেশন বর্তমানে নেতাজির নামাঙ্কিত: “নেতাজি ভবন” (পূর্বনামভবানীপুর) ও “নেতাজি” (পূর্বনাম কুঁদঘাট)।

* চলচ্চিত্র- ১৯৬৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ও ন্যাশনাল এ্যাওয়ার্ড প্রাপ্ত বাংলা ভাষায় নির্মিত পিয়ুস বাসু পরিচালিত- “সুভাষ চন্দ্র“(আশীষ ঘোষ, সমর কুমার, অমর দত্ত,রবিন ব্যানারজী অভিনীত। প্রযেজক- অজিত কুমার ব্যানারজী। সংগীত-অপারেশ লাহেরি)-চলচ্চিত্রটিতে সুন্দরভাবে বাংলার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান বীর দেশপ্রেমী নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও সিরাজের প্রাণ প্রিয় সহধর্মিণী বাংলার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহীয়সী নারী বেগম লুৎফুন্নিসার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়।

লেখক:- নবাবসিরাজউদ্দৌলার৯মরক্তধারাপ্রজন্ম।

এস ইসলাম/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category