পৃথিবীর ইতিহাসে বিশ্ব বীর হযরত ইমাম হোসাইন ও নবাব সিরাজউদ্দৌলা

কালের সংবাদ ডেস্ক: মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর প্রিয় নাতি ইমাম হোসাইন ও আমাদের বাংলার বীর নবাব আলীবর্দী খানের প্রাণপ্রিয় নাতি যুবরাজ সিরাজউদ্দৌলার কথা জেনে নিই।

পৃথিবীর মুসলিম ইতিহাসের ট্র্যাজিক দুই নায়ক ইমাম হোসাইন ও নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে সত্য ন্যায়নীতির অনুসারী হিসাবে সব মানুষই জানেন। দুটি ভিন্ন সময়, দুটি ভিন্ন মানুষ, দুই ভিন্ন ট্র্যাজেডি, কিন্তু যেখানে তারা এক হয়ে যান তা হলো সততা, ন্যায়, নীতি, আদর্শ, দেশপ্রেম, দুঃখ ও আবেগ। প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর প্রিয় নাতি হযরত ইমাম হোসাইন ৩ শাবান ৪ হিজরী জন্মগ্রহণ করেন। নবাব আলীবর্দী খানের প্রাণপ্রিয় নাতি যুবরাজ সিরাজউদ্দৌলা ১৯ সেপ্টেম্বর ১৭২৭ তৎকালীন বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদে জন্মগ্রহণ করেন। ইমাম হোসাইন ও নবাব সিরাজউদ্দৌলা বিশ্বে সত্যের প্রতীক এবং দেশপ্রেমিক বীর যোদ্ধা হিসেবে নন্দিত।

আরব মহাদেশে কারবালা ইরাকের ঐতিহাসিক একটি শহর। যেখানে ফোরাত নদীর কূলে শায়িত রয়েছেন হযরত ইমাম হোসাইন। কারবালায় খুন হয়েছেন হোসাইনের, কিন্তু মৃত্যু হয়েছে খুনি ইয়াজিদের। ৬১ হিজরী ১০ মহররম ইমাম হোসাইন ও তার বাহিনীকে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে দুষ্ট ইয়াজিদ বাহিনী । আর ২ জুলাই পলাশীর যুদ্ধে সিরাজকে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে হত্যার মাধ্যমে চূড়ান্ত যবনিকাপাত ঘটায়।

বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার রক্তস্রোত সেদিন বাংলার মাটির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল। দেশপ্রেমিক যুবক সিরাজ স্বাধীনতা রক্ষার জন্য সব চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র, দেশদ্রোহিতা ও বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে একা দাঁড়িয়েছিলেন।অবশেষে বুকের রক্তে রঞ্জিত করেছিলেন বাংলার মাটি। সিরাজ ছিলেন বাংলার স্বাধীনতার সূর্য । খেলাফতি যুগের পর ইসলামী হুকুমতকে স্বৈরাচারী নেতৃত্বে পদদলিত করেছিল উমাইয়াদের রাজতন্ত্র। ইয়াজিদ ইবনে আমির মাবিয়া ইসলামী শাসনকে যখন বিকৃতির চরম পর্যায়ে নিয়ে যায়, ইসলাম যখন রাজতন্ত্রের বলিতে পরিণত হয় সেই সংকটময় মুহূর্তে ইমাম হোসাইন নিজের রক্ত দিয়ে ইসলামকে রক্ষা করেছিলেন। আর ২৩ জুন ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে কোনো যুদ্ধ হয়নি, যুদ্ধের জয়-পরাজয়ও হয়নি। যা হয়েছে তা হল বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিযোগিতা, চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বিশ্বাসঘাতক মীর জাফর। আর দেশপ্রেমের পরীক্ষায় বিজয়ী হয়েছেন বাংলার প্রিয়জন বাংলার গৌরব নবাব সিরাজউদ্দৌলা।

যিনি ইচ্ছা করলে ইংরেজদের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে বাকি জীবন ভোগ লালসায় কাটিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা না করে দেশের প্রশ্নে, দেশের মানুষের মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে শহীদের পথ বেঁচে নিয়েছেন। আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে যারা ঘৃণ্য অপরাধের কাজ করে, অন্যায়ভাবে খুন-জখম করে, নিরপরাধ মানুষকে শাস্তি দেয়, আল্লাহ তাদের ক্ষমা করেন না। তারা আল্লাহর রুদ্র রোষের শিকার হয়। হযরত ইমাম হোসাইন ও নবাব সিরাজউদ্দৌলা হত্যার বিচার মানুষের আদালতে হয়নি। হয়েছে খোদার আদালতে। দণ্ড বড় কঠোর ছিল। হযরত ইমাম হোসাইন ও সিরাজকে শুধু শারীরিকভাবে হত্যা করা হয়নি। তার চরিত্র হননেরও চেষ্টা চলেছে বছরের পর বছর ধরে। তবে তারা সফল হয়নি।

বিশ্বাসঘাতকতায় রচিত হযরত ইমাম হোসাইন ও নবাব সিরাজউদ্দৌলার অকাল মৃত্যুতে সত্যবাদীরা আজও শোকাভিভূত। হযরত ইমাম হোসাইন ও নবাব সিরাজউদ্দৌলা সত্যকে ভালোবেসে যে বীরত্বের পরিচয় দিয়ে গেছেন, এই ভালোবাসায় তাদের অমর করে রেখেছে। বিশ্ব ইতিহাসে দেশপ্রেম আর বীরত্বের কথা খুঁজতে হলে যাদের কথা সবসময় মনে করতে হবে, তাদের মধ্যে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন দানকারী শহীদ বীরদের শীর্ষের ২টি নাম- প্রথমটি ‘হজরত ইমাম হোসাইন শেষেরটি নবাব সিরাজউদ্দৌলা’। বাংলার যুবরাজ সিরাজউদ্দৌলার আম্মা আমিনা বেগম মানত করেছিলেন যে তার ছেলে সিরাজ নবাব হলেই প্রথমে ইসলামের জন্য শহীদ হওয়া মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর প্রিয় পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে কারবালার প্রান্তরে পুত্র ও পুত্রবধূসহ জিয়ারতে যাবেন। সিরাজ নবাব হওয়ার পর প্রিয় আম্মার মানত পূরণ করেছিলেন কারবালা জিয়ারত করে। পাশাপাশি কারবালা প্রান্তরের মাটি এনে মুর্শিদাবাদে মদিনা মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। যা আজও বর্তমান।

আমাদের হৃদয়ের নবাব বাংলার মাটিতে মিশে আছেন খোশবাগে। এর অবস্থান লালবাগ নদীর খেয়া পার হয়ে ২ কিলোমিটার পর ভাগীরথী নদীর অপর তীরে। কারবালা ও পলাশী ষড়যন্ত্রে যারা নেতৃত্ব দিয়েছিল তাদের পরিণতি হয়েছিল অত্যন্ত ভয়াবহ ও মর্মান্তিক। আল্লাহর কঠিন শাস্তি থেকে তাদের কেউ রক্ষা করতে পারেনি। মৃত্যুর পরও বিশ্ববাসী তাদের এ অপকর্মের প্রতি তীব্র নিন্দাবাদ জানাচ্ছেন, আজীবন জানাবেন। হযরত ইমাম হোসাইন ও নবাব সিরাজউদ্দৌলার আদর্শই যে অতুলনীয় তা আজ সবার কাছেই স্বীকৃত। সেই সত্য আদর্শই এখনো খুঁজছে মানুষ এবং অনুসরণ করছে।

লেখক : নবাব সিরাজউদ্দৌলার ৯ম রক্তধারা প্রজন্ম “ নবাবজাদা আলি আব্বাসউদ্দৌলা ।”

এম কে ইসলাম/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category