নতুন চমক বাইপাস সার্জারিতে

কালের সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: হার্টের বাইপাস সার্জারিতে এক নতুন ধারা তৈরি করেছেন রাজধানীর বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালের একদল চিকিৎসক। কোনোরকম কাটাছেঁড়া ছাড়া পায়ে সামান্য ছিদ্র করে শিরা সংগ্রহ করে হার্টের বাইপাস করছেন তারা।

চিকিৎসাশাস্ত্রের ভাষায় এভাবে শিরা সংগ্রহের পদ্ধতির নাম এন্ডোস্কোপিক ভেইন হারভেস্টিং। সংক্ষেপে ইভিএইচ। বর্তমানে বাংলাদেশের সরকারি বেসরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে  ইভিএইচে বাইপাস সার্জারি হচ্ছে কেবল বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালেই।

হাসপাতালটিতে অত্যাধুনিক এ বাইপাস সার্জারির নেতৃত্ব দিচ্ছেন চিফ কার্ডিয়াক কনসালটেন্ট খ্যাতিমান হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ সার্জন ডা. শওকত আলী। আর ইভিএইচের মাধ্যমে পায়ের শিরা তুলে দিয়ে তাকে সাহায্য করছেন জুনিয়র কনসালটেন্ট  হৃদরোগ সার্জন ডা. তানভীর জামান। আর  শওকত আলী সেই শিরা হাতে পেয়ে নিখুঁতভাবে হৃদরোগিদের হার্টে  লাগিয়ে (গ্রাফ্টিং) বাইপাস সম্পন্ন করে সুস্থ করে বাড়ি পাঠাচ্ছেন। নেই পায়ে কুৎসিত লম্বা দাগ, নেই রক্তপাত, ব্যথা ও ফোলা। বা কি চমৎকার! বিশ্বাস না হলে ঘুরে আসুন হাসপাতালটিতে।

তানভীর জামান ছাড়াও বাইপাস সার্জারিতে শওকত আলীকে সহায়তায় রয়েছেন কার্ডিয়াক এনেসথেসিয়ার চিফ কনসালটেন্ট ডা. শাহিদুর রহমান, সিনিয়র রেজিস্ট্রার ডা. মোহাম্মদ আলী এবং লজিস্টিক সাপোর্ট দিয়ে সহায়তা দিচ্ছেন যুক্তরাজ্যের হেয়ারফিল্ড হাসপাতালের হার্ট এন্ড লাং ট্রান্সপ্লান্ট এন্ড কার্ডিয়াক সার্জারির ট্রাস্ট  গ্রেড সিনিয়র ফেলো ডা. মোবাশশের হুসাইন।  চিকিৎসক দলকে সাহায্য করছেন বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালের প্রশিক্ষিত  নার্স ও আনটেনসিভিস্ট।

ইভিএইচের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে বাইপাস সার্জারি করা হলে হৃদরোগিদের বাড়তি সুবিধা কি জানতে চাইলে চিকিৎসক দলনেতা ও  চিফ কার্ডিয়াক সার্জন ডা. শওকত আলী চব্বিশঘণ্টানিউজ ডটকমকে বলেন প্রথম সুবিধাটি হচ্ছে বাইপাসের পরপরই রোগি হাঁটাচলা করতে স্বস্তিবোধ করেন।

এই হাঁটাচলা বাইপাসের সফলতা এবং হার্টের সুস্থতার জন্য খুবই জরুরি। পা চিড়ে শিরা নেওয়ার পর রোগিরা ক্ষত না শুকানোর আগে এমন আরামে হাঁটতে পারছে না। ইভিএইচের কারণে হাসপাতাল থেকে আগে আগে বাড়ি ফিরতে পারে।

১০ দিনের প্যাকেজে বাইপাস সার্জারির জন্য ভর্তি হলেও  এতদিন লাগে না। ইভিএইচে পা না চিড়ে ২টি বা ৩টি ছিদ্র করে ক্যামেরাযুক্ত বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে শিরা সংগ্রহ করা হয় বলে পায়ে ব্যথা ও দাগ থাকে না বললেই চলে। ইনফেকশনের হার এক শতাংশের কম। রোগি দ্রুত আরোগ্যলাভ করে কর্মজীবনে ফিরতে পারে।

কিন্তু পা চিড়ে বা কেটে শিরা নিলে পায়ের উপরেনিচে অনেকক্ষানি ক্ষত দেখা দেয়। এ ক্ষেত্রে রোগি বয়স্ক হলে, ডায়াবেটিস থাকলে বা মোটাশরীর হলে অপারেশনের সময় এত বড় ক্ষত জোড়া লাগাতে বিভিন্ন জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে।

জটিলতা ছাড়া জোড়া লাগানো  হলেও অপারেশনের পর দীর্ঘসময় পা ব্যথা, ফোলা থাকে। ২ থেকে ২৪ শতাংশের ক্ষেত্রে ইনফেককশন, সেলুলাইটিস, চামড়া মরে যাওয়া, কুৎসিৎ দাগ হতে পারে।  সারাজীবনের জন্য একটি বড় দাগ তো থেকেই যায়।

শওকত আলী বলেন বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে ইভিএইচ পদ্ধতিতে বাইপাস সার্জারি করাতে ১০ শতাংশ ব্যয় বেশি হলেও অন্যান্য প্রাইভেট হাসপাতালের গতানুগতিক বাইপাস সার্জারির খরচের তুলনায় কম। দেশের অন্যান্য প্রাইভেট হাসপাতালে তিন থেকে ৫ লাখ এবং বিদেশে ৫ লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত বাইপাস সার্জারিতে খরচ হয়।

তবে বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাাতালে ইভিএইচ পদ্ধতিতে শিরা সংগ্রহ করে বাইপাস সার্জারিতে ২ লাখ ৮০ হাজার টাকার বেশি খরচ হয় না। ইভিএইচ এক্সপার্ট ডা. তানভীর জামান বলেন, বিশ্বের অনেক দেশেই ইভিএইচ পদ্ধতি জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। এ পদ্ধতিতে তুলনামূলক নাড়াচাড়া কম হয় বলে শিরা নিরাপদ থাকে এবং ঝুঁকিও কম। পদ্ধতিটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। রোগিরাও বেশ আরামবোধ করছে।

স্পেশালাইজ হাসপাতালে ইভিএইচ পদ্ধতির মাধ্যমে বিটিং হার্ট বাইপাস সার্জারির রোগি আনিসুর রহমান মৃধা চব্বিশঘণ্টানিউজ ডটকমকে বলেন পায়ে কাটাছেঁড়া না থাকায় তিনি অপারেশনের পর তাড়াতাড়ি হাঁটতে পারছেন এবং খুবই স্বস্তি লাগছে।

হাসপাতালটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আল এমরান চৌধুরী বলেন গত এপ্রিল মাস থেকে এ পর্যন্ত ইভিএইচ পদ্ধতিতে প্রায় ৫০টি বিটিং হার্ট বাইপাস হয়েছে। রোগিরা সুস্থ আছেন। কেবল বাইপাস সার্জারিই নয়, বাংলাদেশ  স্পেশালাইজড হাসপাতালে হার্টের ভাল্ব প্রতিস্থাপন, জন্মগত ছিদ্র থেকে শুরু করে সব ধরনের কার্ডিয়াক সার্জারি বিশ্বমানের।

এছাড়া হার্টের রিং পরানো, পেসমেকার লাগানো থেকে শুরু করে অন্যান্য সব ধরনের চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে হাসপাতালটিতে। চিকিৎসার মানও বিশ্বের বড় বড় হাসপাতালের মতোই। খরচও অনেক কম।

বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালটিকে সংক্ষেপে বিএইচএস হাসপাতাল নামেও পরিচিত। এর অবস্থান ঢাকার শ্যামলী বাসস্ট্যান্ড ও কল্যাাণপুর বাসস্ট্যান্ডের মধ্যখানে।

এম কে ইসলাম/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category