দু’লাইন ইংরেজি বলতে পারলে এখন বড় চাকরি মেলে

এস এম মনির :  মেরুদণ্ডে যাদের আচার আর আনুষ্ঠানিকতা-সর্বস্তরে ঘুণপোকার আসন, তারাই শুধুমাত্র ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি এলে সর্বস্তরে বাংলা চালুর আবেগে উথলে ওঠেন। বাংলাকে আন্তজার্তিক মাতৃভাষায় পরিণত করা গেছে এটাই কি বড় পাওয়া? এতেই কি সব অর্জন শেষ? বাংলার চেয়ে ইংরেজিকে কি মোক্ষ-জ্ঞান করেন না আমাদের বিদ্বোৎ সমাজ? দু’লাইন ইংরেজি বলতে পারলে এখানে বড় চাকরি মেলে। প্রজাতন্ত্রের প্রথম শ্রেণির কর্ম কর্তা হওয়ার জন্য যে বিসিএস পরীক্ষা দিতে হয় সেখানে মৌখিকে ইংরেজিতে কথা বলতে পারলেই ভালো পদ পাওয়া যায়। যেখানে ইংরেজি সব মুশকিল আসান করে দেয় সেখানে বাংলার শক্তি কোথায়? ব্রিটিশ কলোনির সে সংস্কারের ভুষণ্ডী মাঠের ভূত তাড়াবার জাগরণের মন্ত্র কোথায়? আর আইন-আদালতে বাংলা? সে তো মূল্যহীন আমজনতার দিনগত পাপক্ষয় মাত্র!
আইন-আদালতের সাংবাদিকতা করতে গিয়ে দেখেছি, চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিষ্ট্রেট এবং চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেটের বাংলা যখন লিখি যথাক্রমে মুখ্য মহানগর হাকিম এবং মুখ্য বিচারিক হাকিম- তখন কোনো কোনো বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা প্রতিবাদ করেন। কোনো কাজে তাঁদের খাসকামরায় গেলে তাঁরা এ বিষয়ে সাংবাদিকদের কাছে তাঁদের ‘গোস্বা’ প্রকাশ করেন। অথচ মহামান্য উচ্চ আদালত অর্থাৎ হাইকোর্ট থেকে আদালতে বাংলা ভাষা ব্যবহারের জন্য বিধান দেওয়া হয়েছে। সেটা এরকম এক ভাষা আন্দোলনের মাসেই। বেতার, দূরদর্শনে বাংলাকে বিকৃত করা যাবে না বলে অন্তবর্তীকালীন নির্দেশ দেওয়া আছে।
সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক যখন হাইকোর্টের বিচারপতি ছিলেন সে সময় অর্থাৎ ২০০৭ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি থেকে বাংলায় মামলার রায় লেখা শুরু করেছিলেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এর সংখ্যা ছিল প্রায় দুশো। প্রধান বিচারপতি হওয়ার পরও তিনি বাংলায় রায় লেখা শুরু করেছিলেন। কিন্তু তারপরও উচ্চ আদালতে বাংলার আদর নেই। অনাদরে-অবহেলায় দুঃখিনী অশক্ত বর্ণমালা ফাঁপা রাষ্ট্রযন্ত্রের মিথ্যা স্তাবকতায় বিবর্ণ হতেই থাকে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর। ভাষাকেও বাংলাদেশ নামের মাতৃভূমির মতোই বঞ্চনার মুকুটই শিরোধার্য করতে হয়।
আদালতে বাংলা বিষয়ে আমাদের সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদে রয়েছে ছোট্ট একটি বাক্য। সেটি হচ্ছে ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা।’ কিন্তু বেদনাদায়ক প্রহসন এটাই যে, এখনও পর্যন্ত সর্বস্তরে বাংলা চালু করা সম্ভব হয়নি। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস কারও অজানা নয়। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের ঘটনা এখন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে স্থান পেয়েছে। ২১ ফেব্রুয়ারি সারা বিশ্ব আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করছে। অনেক দেশে রাষ্ট্রভাষা সেসব দেশের আদালতেও স্থান পেয়েছে। কোনো কোনো বিচারক মাতৃভাষায় বিচারকাজ চালাচ্ছেন। রায় দেওয়া হচ্ছে। অথচ ভাষা নিয়ে যে দেশে এত কিছু ঘটেছে, সে দেশের আদালতে বাংলা চালু করা যায়নি।
সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদের ওপর ভিত্তি করে ১৯৮৭ সালে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন প্রণয়ন করা হয়। এ আইনের ২ ও ৩ (১) ধারায় বলা আছে, কর্মস্থলে যদি কোনো ব্যক্তি বাংলা ভাষা ছাড়া অন্য ভাষায় আবেদন বা আপিল করেন, তাহলে তা বেআইনি ও অকার্যকর বলে গণ্য হবে। ৩ ধারায় বলা আছে, কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারি এ আইন অমান্য করলে তা সরকারি কর্মচারি শৃঙ্খলা ও আপিল বিধির অধীনে অসদাচরণ বলে গণ্য হবে এবং এর বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। অসদাচরণের সর্বোচ্চ শাস্তি চাকরিচ্যুতি। এ আইনে কোনো ব্যক্তির শাস্তি হয়েছে এমনটি শোনা যায়নি। এ আইন মানতে বাধ্যও করা হয়নি কাউকে। প্রশাসনে ইংরেজির ব্যবহার চলছে। আদালতেও চলছে। কোনো বাধা নেই।
সবই তালগোল পাকানো। আদালতে ভাষার ব্যবহার চলছে যথেচ্ছভাবে। উচ্চ আদালতে ইংরেজির ব্যবহার বলা যায় বাধ্যতামূলক। তবে নিম্ন আদালতে ইচ্ছেমতো বাংলা-ইংরেজি ব্যবহৃত হয়। আইন বিশারদদের মতে, দেওয়ানি কার্যবিধির ১৩৭ ধারা সংশোধন না হওয়ায় উচ্চ আদালতে বাংলার প্রচলন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ওই ধারায় বলা হয়েছে, ১৩৭ এর ১ উপধারায় “সরকার অন্যভাবে নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই আইন বলবৎ হওয়ার সময় যে ভাষা হাইকোর্ট ডিভিশনের অধীনস্থ আদালতের ভাষা হয় ওই ভাষাই অনুরুপ আদালতের ভাষা হিসাবে চলিতে থাকিবে।” ২ উপধারায় বলা হয়েছে,“অনুরূপ কোনো আদালতের ভাষা কী হইবে এবং অনুরূপ আদালতে কোন ধরনের দরখাস্ত এবং কার্যধারা লিখিত হইবে সরকার উহা ঘোষণা করিতে পারে।” ৩ উপধারায় বলা হয়েছে “যেক্ষেত্রে অনুরূপ আদালতে সাক্ষ্য লিপিবদ্ধ করা ব্যতীত কোনো বিষয় এ আইনে লিখিত হওয়ার প্রয়োজন বোধ হয় বা অনুমতি প্রদান করা হয় সে ক্ষেত্রে অনুরূপ লিখন ইংরেজিতে হইতে পারে; কিন্তু যদি কোনো পক্ষ অথবা তাহার উকিল ইংরেজির সহিত অপরিচিত হন তবে তাহার অনুরোধে আদালতের ভাষায় উহার অনুবাদ তাহাকে সরবরাহ করা হইবে; এবং আদালত ওই অনুবাদের খরচ প্রদান সম্পর্কে উপযুক্ত মনে করে এরূপ আদেশ প্রদান করিবে।”
বাংলা প্রচলনের ক্ষেত্রে সংবিধান ও আইনে বাধ্যবাধকতা থাকলেও আদালত এ বাধ্যবাধকতার বাইরে রয়েছেন। এ প্রশ্নে বেশ কিছু দেওয়ানি বিষয়ের আবেদনপত্র নিষ্পত্তি করতে গিয়ে ১৯৯১ সালের ৮ নভেম্বর হাইকোর্ট একটি রায় দেন। ওই রায়ে বলা হয়, দেওয়ানি কার্যবিধির ১৩৭ ধারার ১ উপধারা মতে, আদালতে ইংরেজির ব্যবহার, যথা রায়, আরজি, সওয়াল-জবাব ইত্যাদি লেখা হলে তা বেআইনি হবে না। কাজেই বাংলা ভাষা প্রচলন আইন প্রণীত হওয়ার আগে আদালতে যেমন ইংরেজি ভাষায় আরজি, সওয়াল-জবাব, দরখাস্ত, রায় লেখা হত- তেমনটি চলতে পারে। ওই রায়ে ভাষার ব্যবহার সম্পর্কে ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়। বলা হয়, ভাষার তিনটি ব্যবহার। এগুলো হচ্ছে- রাষ্ট্রভাষা, সরকারের ভাষা ও আদালতের ভাষা। রাষ্ট্রভাষার অর্থ, যে ভাষা রাষ্ট্রের সব কাজে ব্যবহৃত হয়। সরকারের ভাষা হল নির্বাহী কার্যক্রমে ব্যবহৃত ভাষা। আদালতের ভাষা বিচারিক কার্যক্রমে ব্যবহৃত ভাষা।
হাইকোর্টের এ রায়ের পর আর নিম্ন আদালতে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়নি। শুধু ফেব্রুয়ারি এলেই সরকারের পক্ষ থেকে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহারের প্রশ্ন সামনে আসে, বাংলা প্রচলনের অঙ্গীকার করা হয়। অথচ আদালতে মাতৃভাষা প্রচলনের বাধা দেওয়ানি কার্যবিধির ১৩৭ ধারা সংশোধনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় না। কথার ফুলঝুড়িতে ময়দান গরম হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক কর্তাব্যক্তিদের ভাষাপ্রেম, তাদের দেশপ্রেমের মতোই আন্তরিকতাহীন কিছু বুলি হয়ে ওঠে।
আদালতে বাংলা ভাষা প্রচলনে আইন কমিশনের সুপারিশ রয়েছে। ওই সুপারিশের প্রতি সরকার কোনো নজরই দেয়নি। সুপারিশে বলা হয়েছে, সাংবিধানিক রাষ্ট্রভাষা বাংলা। আইন করে বাংলা চালু করা উচিত। ইংরেজিতে লেখা বিদ্যমান আইনগুলো বাংলায় অনুবাদ করা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি উচ্চতর আদালতেও বাংলায় বিচারকার্য পরিচালনা ও রায় লেখা দরকার। সুপারিশে বলা হয়, যদিও ১৯৮৭ সনে আদালতে বিচারিক কাজসহ অন্যান্য আইনি কাজকর্মে বাধ্যতামূলক বাংলা ব্যবহারের জন্য “বাংলা ভাষা প্রচলন আইন” করা হয়, তারপরও বিশেষত উচ্চ আদালতে ইংরেজির ব্যবহার নির্বিবাদে চলছে। আরও বলা হয়, রায় ইংরেজিতে লেখা হলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বৈষ্যমের শিকার হন। তারা ইংরেজি না বোঝার কারণে খুব বিপদের মধ্যে পড়েন। আদালতের ভাষা তাই গণমানুষের ভাষাকে অনুসরণ করা উচিত।
আইন কমিশনের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, সংবিধানের ৩ নম্বর অনুচ্ছেদ এবং এবং বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ ইনট্রোডকশন অ্যাক্ট ১৯৮৭ অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগের সব কাজ বাংলায় করতে হবে। কিন্তু “হাসমতউল্লাহ বনাম আজমেরী বিবি ও অন্যান্য” মামলার রায়ে হাইকোর্ট বলেন, দেওয়ানী কার্যবিধির ১৩৭ (২) ধারা অনুযায়ী সরকার আদালতে বাংলা ব্যহারের বিষয়ে কোনো ঘোষণা দেবেন না। সুপারিশে বলা হয়, ফৌজদারি কার্যবিধির দুটি এবং দেওয়ানী কার্যবিধির একটি ধারার কারণে আদালতের কাজে বাংলা ব্যবহারের প্রতিবন্ধকতা থেকে যায়। বাধা না থাকলেও উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষার প্রচলন নেই।

এসএম/কেএস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category