275875875

দুদকের মামলায় কারাগারে সাবেক এমপি আউয়াল ও তার স্ত্রী

কালের সংবাদ ডেস্ক: দুদকের মামলায় সাবেক এমপি আউয়াল ও তার স্ত্রী কারাগারে পাঠিয়েছে আদালত। একেএম এ আউয়াল পিরোজপুর-১ (নাজিরপুর, পিরোজপুর সদর ও নেছারাবাদ) আসনের সাবেক এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। তার স্ত্রী জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী  লায়লা পারভীন।  পিরোজপুর জেলা ও দায়রা জজ মো. আব্দুল মান্নান এর আদালত মঙ্গলবার এক আদেশে তাদের কারাগারে পাঠায়।

এর আগে গত ৩০ ডিসেম্বর দুদক বাদী হয়ে তাদের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা দায়ের করেন। এর একটিতে সাবেক এমপি আউয়ালের সঙ্গে তার স্ত্রী লায়লা পারভীনকেও  আসামি করা হয়। এই সব মামলায় তিনি ও তার স্ত্রী গত ৭ জানুয়ারি উচ্চ আদালত থেকে ৮ সপ্তাহের জন্য জামিন নেন। জামিনের মেয়াদ শেষ হলে উচ্চ আদলতের আদেশে মঙ্গলবার (৩ মার্চ)  তিনি স্থানীয় আদালত থেকে জামিন নিতে পিরোজপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালতে হাজির হন।

মামলা সূত্রে জানা গেছে, জেলার নাজিরপুরের থানার সামনে ও উপজেলা সদরের ভূমি অফিসের পিছনে ৬টি ভুয়া ৩ শতাংশ সরকারি খাস জমি নিজের দখলে নেন। পরে সেখানে তিনি দ্বিতল পাকা ভবন তৈরি করে পল্লী বিদ্যুৎকে তাদের অফিস হিসেবে ভাড়া দেয়। এতে চুক্তি করেন সেই সময়ের এমপিপত্নী মিসেস লায়লা পারভীন। জালিয়াতির এ ঘটনার অনুসন্ধানের পর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি এসিল্যান্ড) দুদক কর্মকর্তাকে বলেন, তিনি ওই ছয় ব্যক্তির কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাননি। অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসা ছয় ব্যক্তির অস্তিত্ব  না থাকলেও সাবেক এমপি আউয়ালের স্ত্রী লায়লা পরভীনের নামে বাড়ির বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করা হচ্ছে। এ সংক্রান্ত সব ধরনের প্রমাণ পাওয়ার পর দুদক অনুসন্ধান শেষ করে ওই মামলা দায়ের করে।

দুদকের সূত্র আরো জানায়, সরকারি খাস জায়গা লিজ নিয়ে ওই জায়গায় স্ত্রী লায়লা পারভীনের নামে দ্বিতল পাকা ভবন করে  তা পিরোজপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিকে ভাড়া দিয়ে অবৈধভাবে দখলে রাখার অপরাধে দণ্ডবধির ৪২০/৪০৯/১০৯ ধারাসহ ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় একেএমএ আউয়াল ও তার স্ত্রী লায়লা পারভীনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে দুদক।

প্রায় একই প্রক্রিয়ায় জেলার নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠী) উপজেলার ডাকবাংলোর কাছে একটি সরকারি খাস জমি অবৈধভাবে দখল করে সেখানে তিন তলার একটি ভবন নির্মান করা হয়। যা পরে আউয়াল ফাউন্ডেশন নামকরণ করা হয়। এমপি ক্ষমতা প্রয়োগ করে তিনি এ জালিয়াতির আশ্রয় নেন। ফলে একেএমএ আউয়ালের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০/৪০৯ ধারাসহ ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় আরো একটি মামলা দায়ের করে দুদক।

এছাড়া পিরোজপুর শহরের খুমুরিয়া মৌজার জেএল-৪৬, খতিয়ান নম্বর-২৯৩, রাজার পুকুর নামে পরিচিত ৪৪ শতক সরকারি খাস জমি চারদিকে দেয়াল নির্মাণ করে দখলে নিয়ে নেন আউয়াল। এই অপরাধে আউয়ালের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০/৪০৯ ধারাসহ ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় তৃতীয় মামলা দায়ের করেছেন দুদক। আর এই সব মামলা দায়েরের আগে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাকে (আইয়াল)  দেশত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে একটি চিঠি দেয়।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, এ সব অভিযোগের ভিত্তিতে গত ২০১৭ সালের জুন মাসে  সে সময়ের সরকার দলীয় এমপি আউয়ালের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দুর্নীতি, সরকারি টাকা ও সম্পদ আত্মসতের অভিযোগ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ এনে দুদকে অভিযোগ দেয়া হয়। পরে তা অনুসন্ধানে নামে দুদক টিম। অভিযোগের ভিত্তিতে গত ১৯ মে এমপি আউয়ালকে পরবর্তী ২৩ মে’র মধ্যে দুদকের প্রধান কার্য়ালয় সেগুনবাগিচায় হাজির হয়ে সম্পদের বিবরণী দাখিলের জন্য নোটিশ পাঠানো হয়। কিন্তু আউয়াল ওই সময়ে দুদকে হাজিরা  না দেয়ায় দুদক পরবর্তী ১৯ জুন আবারো তাকে নোটিশ পাঠায়। ওই নোটিশে তাকে ২৭ জুনের মধ্যে হাজির হয়ে সম্পদের বিবরণী দিতে বলা হয়। পরে তিনি হাজির হয়ে বক্তব্য দিলেও সে বক্তব্যে সন্তুষ্ট হয়নি দুদক।

দুদক সূত্র জানান, গত (২০০৮- ২০১৮) পিরোজপুরের স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ, শিক্ষা প্রকৌশল বিভাগ, গণপূর্ত বিভাগ, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, পানিউন্নয়ন বোর্ডসহ যে বিভাগে কাজ হয়েছে তাদের প্রতিটি থেকে ১০ শতাংশ হারে কমিশন নিয়েছেন। এমন কী সরকারিভাবে দুর্যোগপ্রবণ এলাকা ইন্দুরকানি ও মঠবাড়িয়া উপজেলায় ৪টি ঘুর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণকালে তিনি নগদ ৮০ লাখ টাকা ও ২ হাজার ডলার উৎকোচ নেন বলে অভিযোগ পায় দুদক।

দুদকের উপপরিচালক মো. আলী আকবর জানান, অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে তারা (দুদক) নির্বাচন কমিশন, উপ-কর কমিশনারের কার্যালয় (পিরোজপুর), একাধিক ব্যাংকসহ ৩০টি প্রতিষ্ঠনের কাছে চিঠি দেন।

দুর্নীতির বিষয়ে তদন্ত করে দুদক তার বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ পেয়েছেন তা হলো, তার নিয়ন্ত্রণাধীন বুশরা এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স সুভাষ এন্টারপ্রাইজ নামের দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা পিরোজপুরের ঠিকাদারি কাজ নিয়ন্ত্রণ করেছেন।

এছাড়া তিনি কাজ পাওয়া অন্য সব ঠিকাদারের কাছ থেকে শতকরা ১০ ভাগ কমিশন নিয়েছেন। তার দুই আমলে পুলিশের নিয়োগ দেয়া ৭৬৪ জনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে নিয়োগ বাণিজ্য করেছেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আড়াইহাজার শিক্ষক ও ৩২৪ জন নৈশ প্রহরী নিয়োগে বাণিজ্যের অভিযোগ। আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের পদ বাণিজ্য। অবৈধ টাকায় ৪টি কার্গো জাহাজের মালিক।

মুক্তিযোদ্ধার তালিকা তৈরিতে বাণিজ্য, আর চাহিদা মতো টাকা না দিলে তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের। জোর করে হিন্দুসহ অন্যদের প্রায় ডজনখানেক বাড়ি দখল ও লিখে নেয়া। ইউপি নির্বাচনে নিজের পছন্দের বাহিরের প্রার্থীদের বিরোধীতা করে অর্থের বিনিময়ে বিদ্রোহী প্রার্থীদের সমর্থন করা।

এস ইসলাম/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category