‘তিস্তা হামাক বাঁচপার দিবার নয় বাহে’

তন্ময় আহমেদ নয়ন , লালমনিরহাট: এক বার দুই বার নোমায় (নয়), কুড়ি বার বাড়ি সড়া নাগচে। স্বামী নাই বিদুয়া মানুষ। চালাখান (এক ছায়লা ঘর) ধরি মুই এলা কোনটে যাং বাহে। তিস্তা হামাক বাঁচপার দিবার নয়।

সোমবার (১৫ জুলাই) সন্ধ্যায় তিস্তা নদী ভঙনের শিকার সালমা বেওয়া একটু ঠাঁই পেতে এমন আঁকুতি জানান। তিনি লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের কুটিরপাড় বালুর বাঁধ এলাকার মৃত বাচ্চু মিয়ার স্ত্রী। সালমা বেওয়া জানান, গোয়াল ভরা গরু ও গোলা ভরা ধানে ভরপুর ছিল তার সংসার। তিন মেয়ের বিয়ে দিয়ে স্বামী বাচ্চু মিয়া মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর পর দুই ছেলেকে আগলে ঘরে সংসারের হাল ধরেন। ১২ বছর আগে হঠাৎ এক রাতে তিস্তায় বিলিন হয় তার স্বামীর সাজানো সংসার। চোখের সামনে ভেসে যায় সংসারের অনেক মুল্যবান জিনিস। জিবন বাঁচাতে আশ্রয় নেন বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে।

চোখের সামনে সব কিছু ভেসে যেতে দেখে দুই ছেলেই মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়েন। এক সময়ের প্রভাবশালী গৃহিনী সালমার ঠাঁই হয় বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধে। গত ১২ বছরে ২০ বার তিস্তার হিংস্রো থাবায় বিলিন হয়েছে বসতভিটা। কখনো থাকতে হয়েছে খোলা আকাশের নিচে। কখনো রাস্তা বা বাঁধে। সর্বশেষ তিন সপ্তাহ আগে ভাঙনের কবলে পড়ে বাড়ি সড়ায়ে কুটিরপাড় বালু’র বাঁধে আশ্রয় নেন সালমা। বিধিবাম সেখানেও ঠাঁই হয়নি তার। গত কয়েক দিনের প্রবল ভঙনে বালুর বাঁধের প্রায় ২৫-৩০টি বসতভিটা বিলিন হয়েছে। সালমার ছায়লা ঘরটি একদম তিস্তার মুখে পড়েছে। ভাঙন অব্যহত থাকলে রাতেই গিলে খাবে তিস্তা। তাই নদীর ধারে বসে কাদছেন বৃদ্ধা সালমা। কিন্তু কে থামাবে তার কান্না।

সবাই তো ভিটেমাটি হারিয়ে কাদছেন। ওই বাঁধের আব্দুল হাফি মিয়ার বসতভিটার অর্ধেক বিলিন হয়েছে। বাকীটুকু ঘোড়ার গাড়িতে তুলে নিয়ে যাচ্ছেন এক আত্নীয়ের বাড়িতে। তিনি বলেন, এক বান ঢেউটিন ও এক হাজার টাকার ত্রাণ না দিয়ে সরকার দ্রুত নদী খনন করে দুই পাড়ে বাঁধ নির্মান করুক। যাতে আর কাউকে বসতভিটা হারাতে না হয়। আমরা যাতে স্থায়ী ভাবে বসতবাড়ি করে থাকে পারি।

নদীর ধারে বসে হুহু করে কাঁদছেন আলেয়া বেওয়া (৫৬)। তিনি বলেন, এই নদী যৌবনের আয় রোজগার গিলে খেয়েছে। এখন বৃদ্ধ বয়সের ভিক্ষা করে গড়া বসতভিটাও গিলে খাইল। আর কি খাবার বাকী থাকিল?? এমন প্রশ্ন ছুড়ে হুহু করে কাদতে লাগলেন আলেয়া। সালমা বেওয়ার, হাফি বা আলেয়া বেওয়া নয়, গত ৪৮ ঘন্টায় ওই বাঁধের প্রায় ১২/১৫টি বাড়ি তিস্তায় বিলিন হয়েছে। তিস্তা পাড়ের মানুষের মাঝে বিরাজ করছে ভাঙন আতংক। ভাঙনের তীব্রতায় দিশেহারা মানুষের নির্ঘুম রাত কাটছে তিস্তা পাড়ে।

মানুষ ছুটছে মাথা গুজার একটু ঠাঁই পেতে। কিন্তু মিলছে না ঘর তোলার মত জায়গা। ওই বাঁধের সবাই বাড়ি সড়ায়ে নিচ্ছেন। নেই মাথা গুজার ঠাঁই। চরা সুদে ঋন নিয়ে কেউ কেউ জমি বন্দক নিচ্ছেন বাড়ি করতে। কিন্তু নিচু জমি এবং পানি থাকায় ঘর তুলতে পারছেন না। ফলে খোলা আকাশে কাটছে তাদের রাত। সরকারী ভাবে পুনবাসনের কথা বললেও তা কাগজ কলম ঠিক করতে কেটে যাবে কয়েক সপ্তাহ। এরপর হয়তো মিলবে এক বান ঢেউটিন ও এক হাজার টাকা। যা দিয়ে একটি পরিবার পুনবাসন কখনই সম্ভব নয় বলে ক্ষতিগ্রস্থদের দাবি।

সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ, কুলাঘাট ও হাতীবান্ধার বেশ কিছু এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে জেলায় মোট ৪২টি পরিবার তিস্তার ভাঙনের শিকার হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্থদের শুকনা খাবার ও ১০ কেজি হারে চাল দেয়া হয়েছে। মহিষখোচা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোসাদ্দেক হোসেন চৌধুরী বলেন, গত মাস থেকে এ পর্যন্ত এ ইউনিয়নের প্রায় ৫০টি বসতভিটা বিলিন হয়েছে। কুটিরপাড় বালুর বাঁধটি ভাঙনের মুখে পড়েছে। এটি ভেঙ্গে গেলে গতিপথ পরিবর্তন হয়ে লোকালয়ে চলে যাবে নদী। দ্রুত ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান তিনি।

লালমনিরহাট জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব থাকা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আহসান হাবিব বলেন, নিয়মিত ভাঙন কবলিত এলাকার খোঁজ খবর নেয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্থদের আশ্রয়ন কেন্দ্রে যেতে বলা হলেও তারা যাচ্ছে না। তাদের পুনর্বাসন করা হবে। তবে ক্ষতিগ্রস্থরা আশ্রয়ন কেন্দ্রে গেলে তাদের সকল ব্যবস্থা করা হবে বলেও জানান তিনি।

এম কে ইসলাম/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category