Sunday, May 29th, 2022




চার মাসে ছিনতাই চুরির ৫৮৩ মামলা

চার মাসে ছিনতাই চুরির ৫৮৩ মামলা

কালের সংবাদ ডেস্কঃ রাজধানীতে গত চার মাসে চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় ৫৮৩টি মামলা করা হয়েছে। এই সময়ে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে নিহত হয়েছেন পাঁচজন। আহত হয়েছেন পুলিশসহ অন্তত ১৫ জন। এই সংখ্যা গত দুই বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি।

চুরি, ছিনতাইয়ের মতো ঘটনায় থানা-পুলিশ পর্যন্ত যান না ভুক্তভোগীরা। অনেক সময় থানা ছিনতাইয়ের ঘটনায় অন্য মামলা নেয়। অনেক সময় মামলা না নিয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) গ্রহণ করে। ফলে থানার এই তথ্যে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র ফুটে ওঠে না।

রাজধানীতে চুরি, ছিনতাই বৃদ্ধির এই প্রবণতায় রাশ টানতে পুলিশের সব বিভাগকে ১৯টি লিখিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এতে পেশাদার ছিনতাইকারীদের সঙ্গে নতুন করে কারা অপরাধে জড়াচ্ছে, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে বলা হয়েছে। চাকরিচ্যুত পুলিশ সদস্যদের ওপর নজরদারি বাড়াতেও নির্দেশনায় বলা হয়। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) থেকে গত মাসে এই নির্দেশনা জারি করা হয়।

ডিএমপির থানাগুলোর তুলনামূলক অপরাধচিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চুরি ও ছিনতাইয়ের অপরাধে গত জানুয়ারি মাসে ডিএমপির ৫০ থানায় মামলা করা হয়েছিল ১২২টি। ফেব্রুয়ারিতে ১৫১টি, মার্চে ১৫১টি এবং এপ্রিলে ১৫৯টি মামলা করা হয়। গড়ে প্রতি মাসে মামলা করা হয়েছে ১৪৬টি। ২০২১ সালের হিসাবে দেখা যায়, সে বছর গড়ে প্রতি মাসে এমন মামলা করা হয়েছিল ১২৪টি। ২০২০ সালে করা হয়েছিল গড়ে ১১৬টি মামলা।

থানায় হওয়া এসংক্রান্ত মামলার নথি থেকে জানা যায়, পুরনো পেশাদার ছিনতাইকারীদের সঙ্গে নতুন কিছু ছিনতাইকারী যুক্ত হয়েছে। সংখ্যায় এরা ৫০০-এর বেশি। ৫০ থানা এলাকার ৫৭৫টি জায়গায় এদের তৎপরতা আছে। এরা পথচারী, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবীসহ রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও বাসযাত্রীদের টার্গেট করে টাকা, মোবাইল ফোনসহ গুরুত্বপূর্ণ মালপত্র ছিনিয়ে নেয়। ডিএমপি সদর দপ্তরের এক প্রতিবেদনেও এমন তথ্য উঠে এসেছে।

গত চার মাসে ডিএমপি ও র‌্যাবের একাধিক অভিযানে ছিনতাই ও চুরির অভিযোগে অন্তত ৩০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন আগে চাকরিজীবী ছিলেন। চাকরি হারিয়ে তাঁরা এই পথে নেমেছেন। গ্রেপ্তার হওয়াদের মধ্যে চাকরিহারা প্রকৌশলী, চিকিৎসক, শিক্ষকও আছেন।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চুরি, ছিনতাইয়ে যুক্ত হওয়ার একটা বড় কারণ মাদকাসক্তি। মাদকের টাকা জোগাড় করতে বিশেষত ছিন্নমূল তরুণরা ছিনতাইয়ে জড়ায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন করোনার কারণে চাকরিহারা কিছু লোক। তার মানে বেকারত্ব একটা কারণ। সম্প্রতি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিও সমাজে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে।

ডিএমপি কমিশনার মুহা. শফিকুল ইসলাম বলেন, রাজধানীতে ছিনতাই, চুরি ও টানা পার্টি প্রতিরোধে ডিএমপির সব বিভাগকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী স্থানীয় বাসাবাড়ি ও মার্কেটের নিরাপত্তাকর্মী ও কমিউনিটি পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে থানা পুলিশ সমন্বয় করে কাজ করছে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন সড়কে পুলিশের টহল বা চেকপোস্ট বাড়ানো হয়েছে।

ছিনতাইকারীর হাতে নিহত ৫

গত ১৪ মে রাজধানীর রায়েরবাজার মেকাপ খান রোডে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে হোসেন (১৯) নামের এক জুয়েলারি দোকানের কর্মচারীর মৃত্যু হয়। ছিনতাইকারীরা তাঁর মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ নিয়ে যায়।

২৭ মার্চ মিরপুরের কাজীপাড়ায় ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে ডা. বুলবুল হোসেন নামের এক দন্ত চিকিৎসক নিহত হন। ২২ মার্চ উত্তরা আব্দুল্লাহপুরে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে ডালিম শেখ (৩৫) নামের এক পোশাক শ্রমিক নিহত হন।

২০ ফেব্রুয়ারি ভোরে সায়েদাবাদে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে মোশাররফ হোসেন (৪৫) নামের এক কাঁচামাল বিক্রেতা খুন হন। পরের দিন ২১ ফেব্রুয়ারি পল্লবী থানার লালমাটিয়া ট্রাকস্ট্যান্ডে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে রায়হান (২৬) নামের এক পোশাক শ্রমিক নিহত হন। গত চার মাসে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে আহত হয়েছেন পুলিশসহ অন্তত ১৫ জন।

এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা করা হয়েছে। ডা. বুলবুল হত্যার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। ফলে ওই মামলায় দ্রুত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। বাকি খুনের ঘটনায় এখনো কেউ গ্রেপ্তার হয়নি।

তবে সম্প্রতি মগবাজার ও মোহাম্মদপুর পশ্চিম কাটাসুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে চার ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। এ সময় ৩৪ লাখ টাকা, চার হাজার পিস ইয়াবা, দুটি দামি মোটরসাইকেলসহ ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত অন্যান্য সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। পুলিশ বলছে, এই ছিনতাইকারীচক্রের সদস্যদের মধ্যে শিক্ষক, চিকিৎসক ও প্রকৌশলী রয়েছেন। তাঁদের একজন মাসুদ রানা হাওলাদার। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই শিক্ষক স্কুলে পাঠদানের পাশাপাশি কোচিং সেন্টারে ইংরেজি পড়াতেন। হিসাববিজ্ঞানে স্নাতক এই শিক্ষক করোনার সময় চাকরি হারান। এরপর অভাব-অনটনের কারণে একটি ছিনতাইকারীচক্রে যোগ দেন।

শুধু মাসুদ নন, চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ার ও মাদরাসা শিক্ষকের ছিনতাইকারী হওয়ার তথ্যও জানিয়েছে ডিবি। কাজী রায়হান নামের এমনই এক চিকিৎসককে গ্রেপ্তার করে ডিবি জানতে পেরেছে, তিনি দেশের নামকরা একটি মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাস করেছেন। তাঁর কিডনির সমস্যা দেখা দেয়। প্রতি মাসে ডায়ালিসিসের খরচ জোগাতে হিমশিম খেতে থাকেন তিনি। পরে ছিনতাইয়ে নেমে পড়েন।

আশরাফুল ইসলামের গল্পটা ভিন্ন। পেশায় তিনি টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার। জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ডিবি জানায়, ধানমণ্ডির একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে একটি টেক্সটাইল কম্পানিতে চাকরি শুরু করেন। করোনার সময়ে চাকরি চলে গেলে একই কম্পানির ট্রাকচালক লেলিনের সঙ্গে ছিনতাই শুরু করেন তিনি। দিনে দিনে বাড়তে থাকে অবৈধ আয়ের নেশা। ছিনতাইয়ের টাকায় তিনি শ্বশুরের সঙ্গে জমির ব্যবসা শুরু করেন। তাঁর সহযোগী ছিল মগবাজার এলাকার একটি হাসপাতালের দুই অ্যাম্বুল্যান্সচালক জিল্লুর রহমান খান ও সাইফুল ইসলাম শাওন।

সম্প্রতি আজিজ মোহাম্মদ নামে আরো একজনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি জানতে পারে, মাদরাসার শিক্ষকতার চাকরি চলে গেলে তিনি ছিনতাই, চুরির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।

ডিবির গুলশান বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মশিউর রহমান বলেন, শিক্ষিত যুবকরা আর্থিক সংকটকে অজুহাত বানিয়ে অপরাধে জড়াচ্ছেন। যদিও চাকরি চলে যাওয়ার পর তাঁদের যোগ্যতা অনুযায়ী নতুন চাকরিতে যোগদানের সুযোগ ছিল। তবে সহজে বেশি টাকা আয়ের লোভে তাঁরা ছিনতাইকারীচক্রে জড়িয়েছেন।

ডিএমপির হিসাবে ছিনতাইয়ের স্থান

তদন্তে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে ডিবি জানায়, রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটার অন্যতম স্থানগুলো হলো সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, গুলিস্তান, মতিঝিলের ব্যাংকপাড়া, মগবাজার-মৌচাক, হাতিরঝিল, কারওয়ানবাজার, ফার্মগেট, শেওড়াপাড়া, তালতলা, কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ড, মিরপুর-১০, বিমানবন্দর, আজমপুর বাসস্ট্যান্ড, পূর্বাচল ৩০০ ফুট অন্যতম। এ ছাড়া সব কটি উড়ালসেতুর ওপরে-নিচে মোটরসাইকেল আটকে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে।

ডিবি কর্মকর্তা মশিউর রহমান বলেন, ছিনতাইয়ের অনেক ঘটনায় দেখা যায়, ছিনতাই করা জিনিস উদ্ধার হওয়ার পর ভুক্তভোগীরা আর মামলা করতে চান না। এতে অপরাধীরাও ছাড়া পেয়ে যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের সভাপতি সহকারী অধ্যাপক খন্দকার ফারজানা রহমান বলেন, ‘আমাদের মধ্যে সামাজিক নজরদারি ও অন্যের বিপদে এগিয়ে আসার প্রবণতা কম। এই সুযোগে অনেক সময় অপরাধীরা চুরি-ছিনতাই করে পার পেয়ে যায়। তাই এসব ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে আরো চৌকস হতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক নজরদারিও বাড়ানো প্রয়োজন।

একে  আরিফ/

Leave a Reply

Your email address will not be published.

More News Of This Category