আবুল হায়াতের ‘পঞ্চসপ্ততি’ উদযাপন উপলক্ষে স্মারকগ্রন্থ উন্মোচন 

তন্ময় আলমগীর, ঢাক: স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার চর্চা ও তার আরও অনেক পরে বাংলাদেশ টেলিভিশনের টিভিনাটক ও চলচ্চিত্রে দাপিয়ে বেড়ানো অভিনেতা আবুল হায়াত পদার্পণ করলেন ৭৬ বছরে। এই উপলক্ষে রোববার সন্ধ্যায় রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় সংগীত, নৃত্যকলা ও আবৃত্তি ভবনের মিলনায়তনে তার ‘পঞ্চসপ্ততি’র ‘সার্থক জনম তোমার হে শিল্পী সুনিপুণ’ স্মারক গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করে তার সহ ও অনুজ অভিনেতারা।
রোববার বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় শিল্পকলার মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রবীণ এ অভিনেতা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, “ আই ওয়ান্ট টু ডাই অন স্টেজ। এখান থেকে সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কেউ আমাকে সরাতে পারবে না।  আমি অভিনয়কে কখনও ভুলতে পারব না।”
বুয়েটে পুরকৌশলে পড়াশোনা শেষ করে প্রথমে ওয়াসা, পরে আন্তর্জাতিক সংস্থার পরামর্শক হিসেবে তিনি লিবিয়া ও লাওসেও দীর্ঘদিন কাজ করে এসেছেন আবুল হায়াত। কিন্তু বিদেশের জীবন তাকে টানেনি; নাটকের টানে চলে আসেন বাংলাদেশে।
“লিবিয়ার ডলার আমাকে ধরে রাখতে পারেনি। ওয়াসায় থাকলে চেয়ারম্যান বা সচিবও হয়ে যেতে পারতাম। কিন্তু ওসব তো আমার ধাতে নাই। আমাকে প্রশ্ন করেন অনেকে, ‘আপনি তো ইঞ্জিনিয়ার, অভিনেতা হলেন কেমন করে।’ আমি তো অভিনেতা। ওদের কেউ তো প্রশ্ন করল না, আপনি তো অভিনেতা,  ইঞ্জিনিয়ার হলেন কেমন করে? ১০ বছর থেকে যে অভিনয় করে, অভিনয় তো তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে গেছে।”
জন্মদিনের আয়োজনে এসে আবুল হায়াত বলেন, “মাত্র পাঁচ বছর বয়সে মায়ের হাত ধরে অমলেন্দু বিশ্বাসের নাটক দেখতে গিয়েছিলাম। সেই পোকা মাথায় ঢুকে গেল, আমি তো অভিনয় করব। সে পোকা মাথায় আছে আজ অবধি। আজও রাক্ষসের মতো বংশবৃদ্ধি করে চলেছে।”
বুয়েটের শিক্ষা জীবন শেষে অভিনয়ে কিভাবে জড়িয়ে পড়লেন সে কথা জানালেন আবুল হায়াত। “তখন জিয়া হায়দার গ্রুপ থিয়েটার করবে বলে জানাল। তার সাথে আমি নাটকের থিওরি, বিজ্ঞান জানলাম। এখানে এসে জানলাম, টু অ্যাক্ট ইজ নট টু অ্যাক্ট, বাট টু রিঅ্যাক্ট। এ কথা তো আমাকে কেউ বলেনি। আমি সেদিন জানলাম, আমাকে ধরে রাখার কেউ নাই। আমি অভিনয় করব।”
অভিনয় জীবনে কারও প্রতি কোনো অভিযোগ নেই তার। অভিনেতা আবুল হায়াতের সবচেয়ে বড় ঋণ তার বাবা খন্দকার আব্দুস সালামের কাছে। ১৯৪৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর ভারতের মুর্শিদাবাদে জন্ম নেওয়া আবুল হায়াত বাবার চাকরির সুবাদে চলে আসেন চট্টগ্রামে। রেলওয়ে কর্মকর্তা বাবার অনুপ্রেরণাতে তার নাটকের চর্চা এগিয়ে চলে।
“বাবা ছিলেন সংস্কৃতিমনা, তিনি আঁকতে পারতেন, ভালো ছবি আঁকতে পারতেন। কাগজ থেকে ছবি বানাতে পারতেন। এই মানুষটি ছিলেন সব্যসাচী। আমার প্রথম নাটক দেখে বাবা বলেছিলেন, তার নাকি মনে হয়নি আমি অভিনয় করেছি। আমি ভাবতে শুরু করলাম আমি কী তবে কিছুই পারি না। সেই থেকে শুরু। ”
স্ত্রী মাহফুজা খাতুন শিরিনের পাশাপাশি এ অনুষ্ঠানে এসেছিলেন তার দুই মেয়ে বিপাশা হায়াত, নাতাশা হায়াত। নাতি-নাতনীদের সঙ্গে এসেছিলেন দুই জামাতা তৌকির আহমেদ ও শাহেদ শরীফ খান।
তাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন আতাউর রহমান, মামুনুর রশীদ, দিলারা জামান, ডলি জহুর, জাহিদ হাসান, ওয়াহিদা মল্লিক জলি, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, খায়রুল আলম সবুজ, নওয়াজিশ আলী খান, অধ্যাপক আবদুস সেলিম, ইনামুল হক, মুনিরা ইউসুফ মেমী।
জন্মদিনের আয়োজনে বক্তারা তাকে টিভিনাটকের পর আবারও মঞ্চে ফিরে আসতে অনুরোধ করেন। অভিনেতা, নির্দেশক মামুনুর রশীদ বলেন, “আজকে মঞ্চে অভিনয়ের বড় সংকট তৈরি হয়েছে। আবুল হায়াত, অনেক তো হল, জীবিকার তাড়নায় অভিনয়, এবার মঞ্চে ফিরে আসুন। আমি চাইব, আগামী জন্মদিনে তার মঞ্চের কাজ নিয়ে রেট্রোস্পেকটিভ হবে।” আতাউর রহমান বলেন, “অভিনয়টা কি শুধু বিনোদনের জন্য? এখানে তো গণশিক্ষার বিষয়ও রয়েছে। শিল্পীরাও বড় নেতৃত্ব দিতে পারেন সমাজকে। আবুল হায়াত সে ধরনের মানুষ।”
আবুল হায়াতের মতো জীবিকার প্রয়োজনে লিবিয়াতে শিক্ষকতা করতে গিয়েছিলেন খায়রুল আলম সবুজ। আবুল হায়াত দেশে ফিরে আসার পর তিনিও একইভাবে দেশে ফিরে আসেন, যোগ দেন নাট্যমঞ্চে। সবুজ সেদিনের ঘটনা মনে করিয়ে দিয়ে বলেন,“ত্রিপলি এয়ারপোর্টের একটি সিঁড়ি। আমি দেখলাম, হায়াত ভাই, ভাবি , বিপাশা, নাতাশা সে সিঁড়ি দিয়ে যেতে যেতে একসময় অদৃশ্য হয়ে গেলেন। আমার জীবনে সে সিঁড়িটাই বড় ভূমিকা রেখেছে। আমিও ঠিক করলাম,  আমি আর লিবিয়াতে থাকব না, দেশে ফিরব।”
জন্মদিন উপলক্ষে পঞ্চসপ্ততিতে আবুল হায়াত উদযাপন পর্ষদ ‘সার্থক জনম তোমার হে শিল্পী সুনিপুণ’ শিরোনামে একটি স্মারক গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করে। প্রিয় বাংলা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত স্মারক গ্রন্থটি সম্পাদনা করেন জিয়াউল হাসান কিসলু। এই স্মারক গ্রন্থে বাবাকে নিয়ে লেখা নিজের কবিতা পাঠ করেন বিপাশা হায়াত। নিমা রহমান ও আহসান হাবিব নাসিমের সঞ্চালনায় অনু্ষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন ফারহিন খান জয়িতা।
২০০৭ সালে ‘দারুচিনি দ্বীপ’ সিনেমাতে পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান আবুল হায়াত। টিভি নাটকে অভিনয়ের পাশাপাশি নাটক পরিচালনা ও প্রযোজনা করেছেন। নাগরিকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি বেশকটি নাটকে অভিনয়ের পাশাপাশি নির্দেশনা দিয়েছেন এ দলের হয়ে। লিখেছেন বেশকটি নাটকও।
এম কে ইসলাম/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category