আজও কাঁদে সিরাজের প্রাণের বাংলা

নবাবজাদা আলি আব্বাসউদ্দৌলা:

১ম পর্ব: “আর্দশে নওয়াব আলিবর্দি খান, চেতনায় নওয়াব সিরাজউদ্দৌলা, ভালোবাসায় বেগম লুৎফুন্নিসা, হৃদয়ে বাংলাদেশ।” নানান কৌশলে বিশ্বাসঘাতকতার গন্ধ দুর্গন্ধের মধ্য দিয়ে রাজনীতিকদের বিভেদ বিসম্বাদের সুযোগ নিয়েই ৮ হাজার মাইল দূর হতে এসে হিন্দুদের সহায়তায় ইংরেজ পশুরা ক্ষমতা দখল করে ভারতবর্ষ, পাশে ছিল কিছু লোভী মুসলমান।

এরপর মুসলমানদের রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা ও বিচারব্যবস্থা ন্যাক্কারজনভাবে তিলে তিলে ধ্বংস করেছে সেই ইতিহাস জানা থাকা উচিত সকলের । আজ আমাদের কত সমস্যা ছোট্ট এই দেশটিতে। আমাদের অদূরদর্শী অহংকারী হিংসাচর্চাকারী রাজনীতিকরা কী দুর্ভাগ্য আমাদের জন্য বয়ে আনবেন জানি না। দেশপ্রেমীদের সজাগ থেকে প্রার্থনা করা ব্যতীত আর উপায় নেই।

আমাদের সমাজে ভালো সেজে থাকা অভিনেতা রূপি মানুষের চেয়ে খারাপ মানুষ ভালো ৷ কারন খারাপ মানুষকে তো আপনি চিনেন তাই তার থেকে নিশ্চই দুরে থাকবেন, কিন্তু ভালো সেজে থাকা মানুষগুলোকে চিনতে ভুল করবেন ৷ তারা সময় সুযোগ বুঝে আসল রূপ দেখায় ৷ সুন্দর সবসময় সুন্দর হয় না। সুন্দর শিশিতে মদ থাকিলেও তাহা উপাদেয় নহে অথচ জীর্ণ বোতলে দুধ বিক্রী হইলেও তাহা সকলের কাছে শ্রদ্ধেয়। কিছু কিছু মানুষকে দেখতে যতটুকু ভালো দেখায় বাস্তবে কিন্তু তাঁরা,তার ধারে কাছেও নেই.শুধু ভালো মানুষের মুখোশ পড়ে আছে মাত্র। হতাশ হই, ভেঙ্গে পড়ি। আশা ছেড়ে দেই মাঝে মধ্যে। কিন্তু যখন বাংলাদেশ এর লাল-সবুজ হাতে দেশপ্রেমীদের দেখি, তখন আবারো আশায় বুক বাঁধি। বেঁচে থাকুক ওরা, বেঁচে থাকুক, ওরাই তো আমাদের সব কিছু। “ প্রথম বাংলাদেশ, আমার শেষ বাংলাদেশ, জীবন বাংলাদেশ আমার মরণ বাংলাদেশ।

“বাংলার বীর দেশপ্রেমিক নওয়াব আলিবর্দী খান ছিলেন নির্ভীক, ধর্মপরায়ণ ও নিরহংকার। নিজেকে আল্লাহর একজন সাধারণ বান্দা মনে করতেন। তিনি ছিলেন বিরল ব্যক্তিত্বের অধিকারী। একবারের বেশি দু’বার তিনি কোনো কাজের নির্দেশ দিতেন না, এবং সেটাই প্রতিপালিত হত। তাঁর নওয়াবি আমল ভালো থাকায় জিনিসপত্রের মূল্য সহনীয় পর্যায়ে ছিল এবং প্রজাগণ মোটের উপর বলা যায় সুখে স্বাচ্ছন্দে বসবাস করত। এ কথা সব ঐতিহাসিকই স্বীকার করেন, নওয়াব আলিবর্দী খান ছিলেন একজন মহৎ হৃদয়ের ব্যক্তি। দুর্বল চারিত্রিক দোষ ও নিষ্ঠুরতা তার মধ্যে বিন্দুমাত্র ছিল না। এ কথাও সত্যি যে, নাতি সিরাজকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন। যার জন্য তাকেই তিনি বাংলা, বিহার আর উড়িষ্যার মতো একটি বিশাল সাম্রাজ্যে তাঁর উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন। সিরাজের প্রতি এ ভালবাসা আর আস্থাশীলতার প্রধান কারণ সিরাজের মধ্যেই তিনি তার নিজস্ব গুণের প্রতিফলন দেখছিলেন।

আলিবর্দী খানের বিনোদন ছিল তার পরিবার-পরিজন নিয়ে গঠিত অন্দর মহল আর প্রিয়জনদের নিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করা। নওয়াব আলিবর্দী খুব অল্পতেই খুশি থেকে, পরম করুণাময় আল্লাহ তাআলার কাছে নামাজ ও কোরআন পাঠ করে শুকরিয়া আদায় করতেন। আরাম-আয়েশ, কোঠা-বাঈজী, মদ-নেশা এগুলো অসুন্দর জিনিষ থেকে তিনি হর হামেশা দূরেই থাকতেন। তিনি যৌবনকাল হইতে পবিত্র সুনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন সফল নওয়াব এবং নির্ভীক যোদ্ধা। তিনি ছিলেন ধর্মভীরু এবং চরিত্রবান, যা তৎকালীন নওয়াব- বাদশাহগণের মধ্যে বিরল ছিল। সিরাজের নানা চিন্তা-চেতনায় ছিলেন স্বচ্ছ আর সুন্দর ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তাই তো নওয়াব আলিবর্দীর দৈনন্দিন কর্মসূচি থেকে তাঁর সুনিয়ন্ত্রিত জীবনের আভাস পাওয়া যায়। তিনি নির্দিষ্ট সময়ে নির্ধারিত কাজ সম্পন্ন করতেন। তিনি ভোর হবার দুঘণ্টা পূর্বে ঘুম থেকে উঠতেন এবং নামাজ আদায় করতেন। আলিবর্দীর প্রকৃত নাম মীর্জা মোহাম্মদ আলি। আলিবর্দী খান মুঘল সম্রাট কর্তৃক সুবা বাংলার স্বাধীনতার স্বীকৃতি পেয়েছিলেন।

আলিবর্দী খান সাহসী যোদ্ধা ও কূটনীতিক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। বিচক্ষণ ও শক্তিমান নওয়াব আলিবর্দি খান তাঁর অন্যতম দৌহিত্র যুবরাজ সিরাজউদ্দৌলাকে বিশেষ স্নেহের দৃষ্টিতে দেখতেন। সিরাজ সূতিকাগার থেকে নির্গত হলেই মাতামহের অনাবিল স্নেহের পরশ লাভ করেন এবং জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাকে নিজের সান্নিধ্যে রেখেছিলেন। নওয়াব আলিবর্দী খান কিশোর বয়সের সিরাজের বুদ্ধিমত্তা ও শৌর্যবীর্যের প্রতি যথেষ্ট দুর্বল ছিলেন। আলিবর্দী তাঁর নিজের নামানুসারে তারই ভালবাসার মানুষ…সিরাজের নাম রাখেন মীর্জা মোহাম্মদ। গোলাম হোসেন তাবাতাবাই লিখেছেন যে, নওয়াব আলিবর্দী খান শান্তিপ্রিয় ও প্রজাবৎসল শাসক ছিলেন।প্রজাদের শান্তি ও কল্যাণ নবাব আলীবর্দীর কাম্য ছিল এবং তার শাসনকালে প্রজারা এরূপ সুখ শান্তিতে ছিল যে, যেন তারা পিতা বা মাতার কোলেশায়িত আছে। জমিদাররা যাতে প্রজাদের উপর উৎপীড়ন না করতে পারে সেদিকে তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছিল। নওয়াব আলিবর্দী খান পশুপাখি ভালবাসতেন। তাই ইউরোপীয়ানরা কেউ তাকে ভালো আরবী ঘোড়া উপহার দিয়েছেন, কেউ কাবলী বিড়াল,কাট বিড়ালী , ময়ুর, খরগোশ,টিয়া আনিয়ে দিচ্ছেন, কেউবা আফ্রিকা থেকে একজোড়া নতুন রকমের হরিণ আনিয়ে রাজধানীতে পাঠাচ্ছেন। নওয়াব নাকি খোলাখুলিই সকলকে উপদেশ দিতেন, টুপিওয়ালাদের দল ঠিক মৌমাছির মতো। আস্তে আস্তে চাপ দিলে তাদের কাছ থেকে খানিকটা মধু সংগ্রহ করা যায় বটে, কিন্তু খবরদার কেউ যেন তাদের চাকে হাত দিতে না যায়, তা হলেই ওরা হুল ফুটিয়ে দেবে।

মোগল আমলে রাষ্ট্রীয় ভাষা ফার্সি থাকলেও নওয়াব আলিবর্দী খান, নওয়াব সিরাজউদ্দৌলা, বেগম লুৎফুন্নিসা ও তাঁদের প্রিয় পরিবার বাংলার প্রকৃতি, সংস্কৃতি, ভাষা, আচার-ব্যবহারের অনেক কিছুকেই বড্ড বেশি আপন করে নিয়েছিলেন। তাঁরা ফার্সি ভাষার পাশাপাশি বাংলা ও উর্দু ভাষায় সমান দক্ষতা রাখতেন। তাইতো নওয়াব আলিবর্দী খান, যুবরাজ সিরাজউদ্দৌলা ও বেগম লুৎফুন্নিসা তাঁদের প্রিয় পরিবার-পরিজন নিয়ে লাল সবুজের হৃদয়ে শোকাবহ মুহাররম,শাব-এ বারাত, ঈদ, নওরোজ, বাংলা নববর্ষ, বসন্ত উৎসব, নবান্ন উৎসব, হোলি উৎসব, রাখী বন্ধন ভালোবাসার বন্ধনে পালন করতেন। তাঁরা সকল ধর্ম বর্ণ গোত্রের প্রতি ছিলেন শ্রদ্ধাশীল, তাঁরা দেশ পরিচালনায় গণতন্ত্রের সৌরভে সুরভিত করেছেন সকলকে। তাইতো তাঁদের নওয়াবি আমলে সকল ধর্মীয় উৎসব পালন হতো হৃদয়ের বন্ধনে। ১০ এপ্রিল ১৭৫৬ ইং নওয়াব আলীবর্দী খানের আকস্মিক মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমেছিলো সারা বংলা জুড়ে। নিদারুন গ্রীষ্মের মধ্যেও নওয়াব মহল থেকে খোশবাগ পর্যন্ত অগণিত জনতা রাস্তার দুপাশে ভিড় করে থাকে,চার পাশের বাড়ি থেকে নওয়াবের শবাধারের ওপর ফুলের বৃষ্টি হলো। ফুলে ফুলে ছেয়ে গেলো রাস্তার রাঙা মাটি। ছায়া শীতল খোশবাগে যখন নওয়াবের মৃত দেহ এসে পৌছালো তখন সূর্য পশ্চিম আকাশে নিরবে ঢলে পড়ছিল। আর ঘন বৃক্ষের অসংখ্য শাখা প্রশাখার আড়ালে সূর্য ঢাকা পড়ে যায় শোকের ছায়ায় চুপি চুপি। (চলমান)

( লেখক – নবাব সিরাজউদ্দৌলার ৯ম রক্তধারা প্রজন্ম )

 

এম কে ইসলাম/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category