আগামী ১০ ডিসেম্বর বিচারের মুখোমুখি হচ্ছে মিয়ানমার

কালের সংবাদ ডেস্ক: আগামী ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসেই আনুষ্ঠানিকভাবে জবাবদিহির মুখোমুখি হচ্ছে মিয়ানমার। সেদিন নেদারল্যান্ডসের হেগে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে (ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস—আইসিজে) আনুষ্ঠানিকভাবে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার দায়ের করা মামলার শুনানি শুরু হচ্ছে।

জেনোসাইডবিরোধী সনদ লঙ্ঘন এবং রোহিঙ্গাদের ওপর জেনোসাইড চালানোর অভিযোগে গত ১১ নভেম্বর মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) পক্ষে গাম্বিয়া মামলা দায়ের করে। আগামী ১০ থেকে ১২ ডিসেম্বর মামলার শুনানি হবে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন নিয়ে।

জানা গেছে, মিয়ানমার জেনোসাইডবিরোধী সনদ লঙ্ঘন করেছে এবং জেনোসাইড চালাচ্ছে—এমন অভিযোগ নিষ্পত্তির আগে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে মিয়ানমার যাতে জেনোসাইড বন্ধ করে সে বিষয়ে আইসিজের নির্দেশনা চেয়েছে গাম্বিয়া। এদিকে মামলায় মিয়ানমারের পক্ষে নেতৃত্ব দিতে দেশটির স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি নিজেই হেগে উপস্থিত থাকছেন।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো সু চির এবারের ইউরোপযাত্রাকে দেখছে ভিন্নমাত্রার এক সফর হিসেবে। কয়েক বছর আগেও সু চিকে দেখা হচ্ছিল মিয়ানমারের গণতন্ত্রায়ণে আশা-ভরসার প্রতীক হিসেবে। কিন্তু ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে রোহিঙ্গা জেনোসাইডের নতুন মাত্রা এবং দায়িত্বে থেকেও নীরবতা ও কার্যত সমর্থন সু চির গ্রহণযোগ্যতা তলানিতে নামিয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলেছে, সু চি যখন এর আগে পশ্চিম ইউরোপে গিয়েছিলেন তখন তাঁকে দেখা হচ্ছিল অর্ধশতাব্দীর সামরিক শাসনের অবসান ঘটানো ও নির্বাচিত এক বেসামরিক নেত্রী হিসেবে। আর এ সপ্তাহে সু চি পশ্চিম ইউরোপে যাচ্ছেন জেনোসাইডের অভিযোগ মাথায় নিয়ে। যে মিয়ানমার বাহিনী জেনোসাইড ঘটাতে মূল ভূমিকা রেখেছে সেই বাহিনীর সঙ্গেও একসময় বিরোধের জন্য সু চি ছিলেন সুপরিচিত। এখন সু চি যাচ্ছেন সেই বাহিনীর পক্ষে কথা বলতে।

সু চির রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) জ্যেষ্ঠ মুখপাত্র মিও নিয়ন্ট বলেছেন, ‘মিয়ানমারের মতামতের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মতামতের পার্থক্য আছে। রাখাইনে সত্যিকার অর্থে কী হয়েছে তা সু চি ব্যাখ্যা করবেন।’

মিয়ানমার বরাবরই রোহিঙ্গা সংকটের জন্য কথিত জঙ্গিগোষ্ঠী আরসাকে দায়ী করে আসছে। মিয়ানমারের দাবি, আরসার নির্যাতন-নিপীড়নের ভয়েই রোহিঙ্গারা রাখাইন ছেড়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। তবে জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে, আরসার কথিত হামলার বেশ আগে থেকেই মিয়ানমার সামরিক বাহিনী রাখাইনে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াচ্ছিল। জেনোসাইড, গণহত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন-নিপীড়নের মুখে ২০১৭ সালের আগস্ট মাসের পর থেকে সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কূটনীতিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ১০ বছর আগের চেয়েও পরিস্থিতি এখন ভিন্ন। স্যাটেলাইটসহ প্রযুক্তির এই যুগে কোথায় কী হচ্ছে তা জানা যায়।ওই কূটনীতিক বলেন, মিয়ানমারকে কেবল আইসিজেতেই নয়, আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতেও (আইসিসি) জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে।

রোহিঙ্গারা যদি মিয়ানমারের ভেতরে থাকত তাহলে এই সংকটের মাত্রা যা হতো দেশ ছেড়ে বাইরে আসার ফলে তা অনেকটাই ভিন্ন হয়েছে। তারা একেকজন নৃশংস ঘটনার বর্ণনাকারী, সাক্ষী হয়ে এসেছে। আর এগুলোর দিকেই এখন দৃষ্টি দিচ্ছেন আদালত ও জবাবদিহি কাঠামোগুলো।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আইসিসি ব্যক্তিবিশেষের অপরাধ বিচার করবে। আর রাষ্ট্রের বিচার করবে আইসিজে। গাম্বিয়ার মামলায় স্পষ্ট অভিযোগ করা হয়েছে, রোহিঙ্গা জেনোসাইডের উদ্দেশ্যে মিয়ানমারের নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করা হয়েছে। রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গারা শত শত বছর ধরে বসবাস করছে। তারাই সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। মিয়ানমার পরিকল্পিতভাবে রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করেছে। এসব অভিযোগ প্রমাণ হলে মামলার রায় কোন পর্যন্ত গড়ায় তা বলা কঠিন।

জানা গেছে, কয়েক বছর আগেও রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে মিয়ানমারকে প্রস্তাব দিয়েছিল বাংলাদেশ। মিয়ানমার তাতে গুরুত্ব দেয়নি বা আগ্রহ দেখায়নি। বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার দরজা খোলা রাখার পাশাপাশি এই ইস্যুকে সফলভাবে আন্তর্জাতিকীকরণ করেছে। এর ফলে নজিরবিহীন চাপের মুখে পড়েছে মিয়ানমার।

এস ইসলাম/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category